জুলাই ২০২০- একটা দুঃস্বপ্ন

কিছুদন হল আর ঘুম আসেনা ঠিকমত; সপ্তাহ, মাস, বার বা সময়ের হিসাবও মনে পরেনা স্পষ্ট করে, শুধু দিন আর রাত্রিটা বুঝি। এখন অন্ধকারই বড় প্রিয় লাগে, নিজেকেও দেখা যায়না যে। অন্ধকারের ক্লান্তিতে, একাকীত্বের হাহাকার মাখা আকাশের চাঁদের দিকে চেয়ে থাকি পাণ্ডুর কৃশকায় অবসন্ন শরীরে। সন্ধ্যা আর ভোরের ফারাকটা আজকাল খুব স্পষ্ট, কারন ভোর হলেই আঁধার কেটে দিনের বিভীষিকা ফুটে উঠে চোখে। অন্ধকারে খোলা আকাশের দিকে তাকালে লক্ষ কোটি তারাদের দেখে একাকীত্ব দুর করতে হয়, স্ত্রী সন্তানদের কাছে ফিরে যাওয়া মানেই অভাবের তাড়নায় বিকারগ্রস্থ কিছু উন্মাদের অবুঝ চিৎকার। অনেক মানুষ আছে যাদের মশা খুঁজে খুঁজে কামড়ায়, আমি সেই গোত্রের। হাড় হিড়জিড়ে শরীরে তাদের জন্যও পর্যাপ্ত রসদ নেই।

 আমার বাড়িটা ঠিক রাস্তার উপরেই, টোলের অনেকগুলো পয়সা বাঁচাতে এই পথে গাড়ির ভিড় ছিল খুব। আজকে এ রাস্তায় শুধুই কিছু হরিধ্বনির আওয়াজ, পুলিস গাড়ির সাইরেন, স্বজনহারাদের গুমরে থাকা আর্তনাদে বাতাস এমনিতেই ভীষণ ভারি, তাকে ভেদ করে কোনো আওয়াজই আর কানে পৌঁছায়না। শকুন ও শেয়ালের আমদানি বেড়েছে, কুকুর বিড়ালেরাও খাদ্যাভ্যাস বদলেছে বোধহয়। আকাশের বুকে কিছু ইতিউতি কালো মেঘ ছাড়া মৃত আত্মাদের ভিড়ে দলা পাকিয়ে আছে স্তূপাকৃতি বিলাপেরা, প্রলাপে ভেজা দীর্ঘশ্বাসেরা প্রতিদিন শিশির হয়ে ঝরে পরে মাটিতে মিশে গেছে। কান্নারা নদী বেয়ে সাগরের জলে মিলিত হয়ে পরিচয় হারিয়েছে। ইতিউতি কয়েকজন আমার মত হতভাগ্যরা অন্তিম যাত্রার পথিক সেজে মৃত্যুর একঘেয়ে পালা গানে শতরঞ্চি-ওয়ালা সেজে বসে আছি পালা শেষ হবার প্রতীক্ষায়, একটু একটু করে এগিয়ে চলেছি নিয়তির দিকে।

২০২০ ধামাকা অফারে জিও সিমটাতে সেই আগামী ২০২১ পর্যন্ত ভ্যালিডিটি রয়েছে, এয়ারটেলটা গত এপ্রিলের শুরুতে রিচার্জ করেছিলাম, তারও আয়ু একবছর ছিল। সবই ছিল, এখন আর নেই। নেই রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে শুধু এটুকু মনে রয়েছে একটা সময় আমাদের সবই ছিল, সেটা ঐ এপ্রিল মাস পর্যন্ত। না ‘সব’ বোধহয় ছিলনা, কারন অনুশাসন ছিলনা, সামাজিকতার জ্ঞান ছিলনা। আমাদের রাজ্য, রাষ্ট্র, প্রশাসন যন্ত্র সবই ছিল, তারা সভ্যতাকে বাঁচাবার প্রচেষ্টা কিছু কম করেনি। ছিল উদাসীনতা, ছিলনা সচেতনতা, তাই অধিকাংশই ছিল হয়ে গেছে। আমার এখন অখন্ড অবসর কাটে ছাদের চাতাল টুকুতে, একা। আশেপাশে আত্মীয়স্বজনদের ঘর, সেগুলো সব মৃত্যুপুরী। কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে সেটা জানি, বাকিটার বিষয়ে কিছুই জানিনা। যেমন জানিনা আমার কন্যা, মা, স্ত্রী ঠিক কতদিন আর আমার সাথে থাকবেন।

আজ ইলেকট্রিসিটি নেই সপ্তাখানেক হল, সেই রবি… না না বুধ, উঁহু- কীজানি কি বার ছিল; সেদিনের পর থেকে আর বিদ্যুৎ আসেনি। কারেন্ট নেই বলে ঘরের টিভিও চলেনি। মোবাইল সিমের ভ্যালিডিটি থাকলেও বিদ্যুতের অভাবে সেগুলো মৃত। বর্হিঃবিশ্বের সাথে যোগাযোগের অন্তিম সুত্র টুকুও ছিঁড়ে গেছে সেই থেকে। তাতে অবশ্য কিছুটা স্বস্তিতেই রয়েছি, এপ্রিল পর্যন্ত আমি সহ বহু সহনাগরিকেরাই সরকারের সমালোচনা, হিন্দু-মুসলিম, আর ঝগড়া অশান্তিতেই মেতেছিলাম। টিভি চ্যানেল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়েও ছিল শুধুই ঘৃণার চাষ, জানিনা আজ তারা স্টুডিওতে কি করছে। জুনের শেষে ঈদ হয়েছিল, অনেকেরই প্রথববার ঈদের নামাজ পরার সৌভাগ্য হয়নি, মানে জমায়েত এড়িয়েছিল। অনেকেই চৈত্র সংক্রান্তিতে, মনসা পুজোতেও নিজেকে গৃহবন্দী রেখেছিল। জানিনা এগুলো সৌভাগ্য ছিল, না দুর্ভাগ্য; আমার মত এক দুজন যারা বেঁচে আছে তারা ঐ দুর্ভাগাদের দল। ছাদে উঠে খুব জোরে চিৎকার করেছিলাম গতকাল রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে, মোদক বাড়ি থেকে একটা সাড়া এসেছিল। সদ্য কোলাহলের বাঙাল পাড়াও নিস্তব্ধ, অবশিষ্ট বলতে শুধুই ঝিঁঝিঁর ডাক আর ব্যাঙেদের সম্মিলনী।

অধিকাংশ ঘরে প্রায় সকল কিছুই বিদ্যুৎ চালিত, তাই জলের ভীষণ সমস্যা আজ। ঘরের কলেও যেমন জল নেই, রাস্তার সজলধারা প্রকল্পের পাইপেও মরুভূমির শুষ্কতা। বর্তমানে অসামাজিকদের আখড়া নামে পরিচিত সেই অচ্ছুৎ ধাঙড় পাড়ার একটা চাপা-কলই ভরষা, ছুৎ অচ্ছুৎ আজ সবই মুছে গেছে মহামারীর প্রকোপে। অনেকেই জলের খোঁজে যায় গভীর রাত্রে, যাতে ভুলেও কারো সাথে দেখা না হয়ে যায়। তবুও ইস্কুল পাড়ার মিত্রবাবুর সুন্দরী মেয়েটা সাথে চোখোচোখি হয়ে গেল ফেরার পথে, সে এই রাত্রে একা একটা সাইকেল নিয়ে জলের খোঁজেই এসেছে। শ্লীলতাহানি, ধর্ষন, নিপীড়ন, ভুতের ভয় সবই যেন উবে গেছে সমাজের বুক থেকে- সবাই বাঁচতে চাইছে, বাঁচার জন্য পালাতে চাইছে।

গত এপ্রিলেই রাস্তার ধারের একটা জাইগা কিনেছিল মজুমদারেরা, মুর্তাজা সাহেবের থেকে জলের দড়েই পেয়েছিল কারন আজ বহু বছর একটা কুঁড়ে বেঁধে রাস্তার ফ্রন্টটা দখল করেছিল বৃদ্ধা পার্বতী বাগ আর তার রুগ্ন ছেলে তপন। মজুমদারেরা ঠিক কবে জাইগাটা কিনেছিল জানিনা, মোল্লাপাড়ার শাসক ঘনিষ্ট হোসেনের দল আর মাহাতোদের কানাহরি মিলে যখন মদ বেচার অপরাধে তপনকে পিটিয়ে মেরে দিল তখনই জেনেছিলাম এ জাইগাটা বিক্রি হয়ে গেছে। তপনকে নিশ্চই তাদের মারার প্ল্যান ছিলনা, কিন্তু রোগ আর অপুষ্টিতে ভোগা ছেলেটি কয়েকটা লাঠির ঘা ই সহ্য করতে পারেনি। লকডাউনের তখন প্রথম ১৫ দিনও পেরোয়নি। তপনের বৌ’টার বয়স মেরেকেটে বছর চব্বিশেক হবে হয়ত, সারাক্ষণ ঘোমটা টেনেই থাকত, তাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তিনটে বাচ্চা অনাথ হয়েছে। লকডাউনে আইন ও প্রশাসনও ঘরেই ছিল, তাছাড়া পয়সাওয়ালা কেউ হলে যদিওবা একটু চেল্লামেল্লি হওয়ার চান্স ছিল- হতভাগ্য তপনের সেটুকুও জোটেনি। অবশ্য একটা দলীয় পতাকা জুটেছিল ঘাটে নিয়ে যাবার সময়, তপন ভাগ্যবান তার নশ্বর দেহটার সৎকার তো হয়েছিল, আমার সেটুকু হবে কিনা নিশ্চিত নই।

তপনের তিন বাচ্চাকে নিয়ে বৃদ্ধা পার্বতী খুব বেশি কিছু করতে পারেনি, খালবিল থেকে মাছ ধরে এনে, দান ও রেশনের চাল দিয়ে কোনো রকমে চলে যাচ্ছিল। বৃদ্ধা পার্বতিকেও আর দেখতে পাচ্ছিনা কয়েকদিন হল, হয়ত জ্বরের ঘোরে কোথায় মরে পড়ে রয়েছে জলা-জঙ্গলে। পার্বতীর ঘরটা দখিনের ছোট ঘর থেকে দেখা যায় নিমগাছের ফাঁক দিয়ে। বাচ্চা গুলো বুঝেছে বাইরে গেলেই মৃত্যু, তারা এটাও জানে গোটা পৃথিবিতেই আজ তাদের সংখ্যা বেশি, আগামীর সভ্যতাটাই যে অনাথদের সভত্যা। অথচ আমরা ততাকথিত শিক্ষিতরা এই সত্যটুকু বুঝিনি, উজার হয়ে আবার আগে।   

শেষ বার ফেসবুক খুলেছিলাম ইলেকট্রিক চলে যাওয়ার অনেক আগে, সেই বর্ষার শুরুতে। সেখানেও বিগত ১০ বছর ধরে যাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্বে, ঝগরায়, গল্পে, সৌহার্দে, দৈনিক আলাপচারিতায়, তাদের অনেকেই একে একে মৃত্যুর খাতায় নাম লিখিয়েছিল। নিঃসঙ্গ কাটাতে এসে আরো বেশি করে বিষাদে ডুবে যেতাম, কথা বলার জন্য কেউ বেঁচে ছিলনা। অপরিচিতদের সাথে বেঁচে থাকার কথা বলে মন ভিজতনা, তাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তার কয়েকদিন পর পর্যন্ত মেডিকেল বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছিল সরকারী তরফে, তারপর আর আসেনি কোনো খবর। সরকারী হিসাবে মৃত্যু ৩ এই আঁটকে ছিল। আজ সেখানেও হয়ত খবর দেওয়ার জন্য কেউ বেঁচে নেই, বা যিনি বেঁচে আছেন তিনি ঘরকেই গুহা বানিয়ে নিয়েছে বাঁচার অন্তিম আকুতিতে।

আসলে বাঁচার যে অন্তিম আকুতি, সেটাই আমাদের মাঝ ছিলনা। চুড়ান্ত বেলেল্লাপনা আর উদাসীন জাতিটা সামান্যটুকু লড়াই দিতে পারলনা, প্রশাসনের সমস্ত প্রচেষ্টা, রক্তচক্ষু, ধমক-চমক সবই প্রথম অর্ধ মাসকাল কিছুটা মেনেছিল হতভাগ্য জাতিটা। অযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান অতীতেও ছিল আজও আছে, তবুও নাগরিকদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেমন করে হোক সমালোচনা করা- নির্দেশ অমান্য করে পথে নামা। একদল সরকারের পক্ষে নিজেদের প্রমানের জন্য উল্লাস করেছিল, আরেকটা দল বিরোধিতার শক্তি প্রদর্শন করেছিল। ট্রেন বাস চলা শুরু হতে হতেও হয়নি, তার জন্য মানুষের কর্ম জগতে ফেরার কোনো উপায়ন্তর ছিলনা, তাই সকলে নিয়ম করে পথে নেমে আসত বাজার করার বাহানাতে হোক বা অন্য কিছুর উছিলাতে। এখন সেই বিরোধও আর চোখে পরছেনা দিন পনেরো হল, কি করেইবা পরবে- শেষ বেসরকারী বুলেটিনেই ভারত রাষ্ট্রে মৃত ৪ কটি ৭৪ লক্ষ… পরের সংখাটা মনে নেই। করোনাতে আক্রান্ত অন্তত ৫০ কোটি ভারতীয়। বলে দিয়ে যাওয়া ভাল, কারন আগামী প্রজন্ম বলে যদি কিছু থাকে আর তারা যদি অতীতকে খনন করতে গিয়ে এই লেখা পায়, তারা জানবে একটা মূর্খ জাতি কেমন করে ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল। কাগুজে শিক্ষার সাথে মিথ্য রটনা, বাস্তবকে না বোঝা, প্রকৃত জ্ঞানের অভাব শেষ করে দিয়েছে একটা মুর্খ জাতিকে।

আজ নিশ্চই মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যাটা অনেকটাই বেড়েছে, শুনলাম পড়শি নাপিতদের বাড়িতে আর কেউ বেঁচে নেই। জল আনতে গিয়ে যদিও আলাদা করে আর লাশ পচার গন্ধ পায়নি, অবশ্য গন্ধটা সয়ে গেছে নাকে; কারন বিগত কয়েকটা সপ্তাহজুড়ে বাতাসে শুধু এই একটাই তো গন্ধ। লাশ পোড়াবে বা কবর দেবে সেই লোক আজ মেলেনা। অথচ লকডাউনের সময়েও পরিয়ায়ী শ্রমিকের অল্পবয়সী দলগুলো গোটা পাড়া জুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, যেন ছুটিতে ফুর্তি করতে এসেছিল। কুর্মি পাড়ার শৈলেন, বারণ করতে গিয়ে মার খেয়েছিল, রতন সরকারের ছেলে সিন্টু আর মতিলাল শেখের নাতি রমজান মিলে শৈলেনকে মেরেছিল। বাগদি পাড়ার তপা থানা নালিশ করতে গিয়ে চরম নাকাল হয়েছিল, উল্টে তাকেই হাজতে ভরে দিয়েছিল পুলিস, সেখানেই নাকি ভাইরাসে তাকে ধরে হাজতে। তারপর থেকে কেউ ভুল করেও আর থানার পথ মারায়নি। বাকি রাজ্য বা দেশের কথা, জানিনা কোথায় কীভাবে মড়ক লেগেছিল, কিন্তু এটা জানি ধর্মীয় জমায়েতে করোনার জন্য স্পেশাল দোয়া/প্রার্থনা হয়েছিল ভীষণ ঘটা করে। তারপর কয়েক সপ্তাহেই সৃষ্টি আদিতে ফেরার জোয়ারের ঢলে পিছিয়ে চলেছে দুর্দমনীয় গতিতে, কেউ কোথাও নেই। মানে মানুষ নেই, বাকিরা সকলেই আছে।

উঁচু উঁচু দালান বাড়ি গুলো সভ্যতার ইতিহাস বহন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খাবার ফুরিয়ে এসেছে, ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে রোজ সন্ধ্যায়। গলাপচা লাসগুলোর সদগতি হচ্ছে। পিচ রাস্তার মাটি বের হওয়া জাইগা গুলোতে ঘাস গজিয়েছে, পোষা ছাগল গরুরাও আজ মুক্ত, প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে উদ্ভিদ প্রজাতিকে সাজিয়ে তুলেছে। কয়েকটা দিন শাকপাতা কচুঘেঁচু খেয়ে দেখিছি, গাছে গাছে পাকা আম জাম ফল ফুলুরি খেয়ে আর কদিন কাটানো যায়। আমি সহ্য করে ফেললেও, বাচ্চাগুলো বমি করে ফেলছে। তারা তপনের বাচ্চাগুলোর মত শিক্ষিত হয়ে উঠেনি আদরে। তপনের বড় ছেলেটির বুদ্ধিতে গতকাল রাত্রের আঁধারে, মড়কে সাফ হয়ে যাওয়া কয়েকটি বাড়ি থেকে চাল চুড়ি করে এনে একবেলা খেয়েছি বেশ কয়েকদিন পর। বাচ্চাটি কয়েকটা পাখীর ডিমও কোত্থেকে এনেছিল, আমরা খেতে পারিনি, স্বাদের বিলাসিতা আজও রয়েছে জিভে।

বাড়ির ছাদে আর চিলেকোঠায় থাকি, মই বেয়ে যাতায়াত; একতলে দ্বিতলে বাকি সদস্যারা। জানিনা আজকের এই বাধ্যতামূলক বাইরে যাওয়া আমাকে কতদিন আর বাঁচিয়ে রাখবে। বাস স্টান্ডে বাসগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে, রেল ইয়ার্ডে রেলের কোচ গুলো, মন্দির মসজিদ গুরদুয়ারা গুলোও খালি, ভক্তের প্রতীক্ষাতে ঈশ্বর একা। শুধু মানুষ প্রজাতিটাই যেন নেই হয়ে গেছে, যারা আছে তারাও প্রকৃত অর্থে আইসোলেশনে রয়েছে। অথচ যখন সত্যিকারের গৃহবন্দী থেকে নিজেকে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে বাঁচাবার চেষ্টা হয়েছিল লকডাউনের নামে, তখন দু’সপ্তাহ কাটার আগেই রাস্তায় সকল কিছুই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। লেদ মেশিনের হাতুরি ঠোকার আওয়াজ, রাজমিস্ত্রির ছাদের সেন্টারিং, ছুতোরের ঠুকঠাক, দর্জির কাঁচির আওয়াজ, জুতোর দোকানীর চৈত্র সেল, ধোপা, নাপিত, জেলে, হাট, বাজার, সবই চালু হয়ে গিয়েছিল। গৃহশিক্ষকেরাও পড়াশোনার ক্ষতি ঠেকাতে বাড়ি বাড়ি যেতে শুরু করেছিলেন, বাবুদের বিবিরা কাজের দিদিদের ডেকে এনেছিলেন। বাঙ্কে ব্যাঙ্কে লম্বা লাইন সরকারী অনুদানের টাকার জন্য, রেশন দোকানেও সেই একই অবস্থা ছিল। লোভে পাপ, আর পাপে মৃত্যু।

২১ দিনের লকডাউন ধাপে ধাপে বৃদ্ধি হয়েছিল, আক্ষরিক অর্থে আজও তা সরকারিভাবে চালু রয়েছে, এটা জুলাই মাসের শেষের দিকের কোনো একটা তারিখ হবে হয়ত। মানুষ ১৫ টা দিন ঘরে থাকতে পারেনি, আজ সবই অতীত। সর্বপ্রথম ডাক্তারদের মড়ক লেগেছিল, জীবানু নিরোধক পোশাক ও প্রয়োজনীয় ঔষধপত্রের অভাবে। নাগরিকেরা ডাক্তারহীন দেশে বিনা চিকিৎসাতে মুছে যেতে চলেছে। কিছুজন বেঁচে আছি যারা অধিক ভয়ে বা ক্রনিক রোগের দরুন বাইরে বের হতে পারিনি। দিনের সূর্যকে ছাড়া আর কিছুকেই বিশ্বাস করার উপায় নেই, অত্যাচারিত প্রকৃতি আজ অহংকারী মানব জাতির উপর বদলা নিয়েছে, তার রুদ্র রোষের কবলে ফেলে তছনছ করে দিয়েছে কলহপ্রিয় মানুষকে। জানালা দিয়ে আমড়া গাছটায় থোকা থোকা ঝুলে থাকা ফলে কাঠবেড়ালিরা লুকোচুরি খেলছে, দূরে বাঁদরের দল কোনো ফলের গাছে চড়ুইভাতি করছে সোল্লাসে। তারা বেঁচে আছে, কারন তারা মানুষ ছিলনা।

গ্যারেজে গাড়ি আছে, কোথায় যাব চড়ে? ব্যাঙ্কে টাকা আছে, কি কিনব আর কার থেকে কিনব? সবই তো অপ্রয়োজনীয় কাগজের বান্ডিল। মা, বৌ’এর সোনা রয়েছে, অদৌ বেঁচে থাকব কিনা তারই যখন নিশ্চয়তা নেই তখন অলঙ্কার কোন কাজে আসবে? ওষুদের দোকানের বিজ্ঞাপন আছে ওষুধ নেই, ফ্যান নেই, এসি নেই, স্যাম্পু নেই, সুগন্ধি নেই, বিরিয়ানি কাবাবের গল্প নেই, বিউটিপার্লার নেই, বিদেশ ভ্রমণ নেই, কর্ম নেই, পড়াশোনা নেই, হানাহানি নেই, ক্লান্তি নেই, প্রাইমটাইম নেই, ইনস্যুরেন্স নেই, রাজনীতি নেই, টেনশন নেই, ধনী নেই, গরীব নেই, কমিউনিস্ট নেই, পুঁজিবাদ নেই, আদর-সোহাগ কিচ্ছুটি নেই; আছে শুধু ভয়- মৃত্যু ভয়।   

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবাজেদের কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ,পরমাণু বোমা ও হরেক সরঞ্জামগুলোর পরিণতি কী হবে? যদি শেষ মানুষটি বেঁচে থাকে সে সেগুলোকে দিয়ে কি কিনে খাবে? কে তাকে শুধাবে তার ধর্ম কি? তার দেশ কোথায়?

ভীষণ জ্বালা অনুভূত হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল নিজের গালেই নিজে চড় মারি। চটাস করে একটা চড় লাগাতেই দেখি হাতে রক্ত, মশা মরেছে। দূরে পরিতোষ কপালীদের বাড়িতে একটা হলুদ ডুম জ্বলছে। ঝেড়েমেরে উঠে বসলাম, দেখি কারেন্ট তো রয়েছে। বালিশের গোঁড়ায় থাকা মোবাইলটাতে আঙুল ছোঁয়াতে সে জানিয়ে দিল আজকে ৭ তারিখ, ৭ই এপ্রিল ২০২০। তাড়াতাড়ি খবরের সাইট খুলতে দেখলাম মাননীয়া বলেছেন রাজ্যে মৃত আজও সেই তিনেই আঁটকে। লোডশেডিং এর ফলে ছাদে শুতে এসে এই দুঃস্বপ্নের কবলে পরা।

উফ, কি সাংঘাতিক দুঃস্বপ্ন। কখনও যেন ঐ দিনটা জীবনে না আসে, তার জন্য আমাদেরই সচেতন হতে হবে, নতুবা কে বলতে পারে আগামীর শেষ জুলাই এমনই কিছু বয়ে আনছে কিনা অসংযমী আমাদের জন্য!

ভাবুন, ভাবা অভ্যাস করুন।    

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *