গণতন্ত্রঃ মিথ ও আগামী পৃথিবী-১

পর্ব- ০১

মাঝে মাঝেই আমরা শুনি গণতন্ত্র বিপন্ন, কিম্বা বড্ড অগণতান্ত্রিক ইত্যাদি বাক্যগুলি। শিরোনামে থাকে- কোথাও না কোথাও গণতন্ত্র লঙ্ঘিতও হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনিই। কখনও মনে হয়নি এই গণতন্ত্র বিষয়টা কি? তার সংজ্ঞা কি? চলুননা গণতন্ত্র নিয়ে আমরা একটু পড়াশোনা করি।

অভিধান বলছে- ‘জনগণ দ্বারা নির্বাচিত, সবচেয়ে যোগ্য জনপ্রতিনিধি দ্বারা প্রশাসন যন্ত্রকে জনহিতে পরিচালনা করার প্রণালী বা সরকারকে এক কথায় গণতন্ত্র বলে’। সুতরাং, জনগণ, যোগ্য, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, জনহিত ও পরিচালনা এই সবগুলি থাকলে তবেই গণতন্ত্র, এপর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এগুলো একটা বা একাধিক না থাকে তাহলে কি! এখানেই হল আসল মজাটা, সে প্রশ্নে পরে আসব। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে যে কেউ জানবে যে- জনগণকে পরিসেবা দেওয়া যন্ত্র ছিল গণতন্ত্র, সেখান থেকে শাসকে তার রূপান্তর ঘটেছে। সে সব বিষয়ে অবশ্যই আসব, তারও আগে চলুন অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটু চোখ বুলিয়ে নিই।

গণতন্ত্র নামক শব্দটার উৎপত্তি সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৫০০ সনে, গ্রীসের আথেন্স নগরীতে। তৎকালীন ‘এ্যালকমেওনিড’ নামের অভিজাত বংশীয় এক আইনজীবি, ‘ক্লিয়েস্থিনিস’কে গণতন্ত্রের জনক হিসাবে অবিহিত করা হয়। পরবর্তীতে প্রখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল গণতন্ত্র বিষয়ে বহুবিধ জ্ঞান ও তত্ত্ব রচনা করেন। “government will be rule by the best over the rest. an aristocracy based on merit rather than blood” এই ছিল তার প্রবচনের অন্যতম মূলমন্ত্র।

পরবর্তী প্রায় ২০০০ বছর এর তেমন কোনো খোঁজখবর ছিলনা। খ্রিষ্ট পরবর্তী সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় সংসদপন্থী ‘রাউন্ডহেড’ ও রাজা চার্লস-১ এর অনুগামী ‘কাভালিয়ার’ দের মাঝে। এরই দীর্ঘমেয়াদি ফলশ্রুতি হিসাবে ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের দুটো রাজত্ব একসাথে মিশে গিয়ে গিয়ে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্টা হয়, যা ক্রমশই শক্তিশালী হতে থাকে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপের অন্য অনেক দেশেই তখন গণতন্ত্র বিস্তার শুরু করে দিয়েছে, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া প্রমুখ তাদের অন্যতম।

বিশ্বের অন্যপ্রান্তে ইউরোপিয়ান লুঠেরা জাতিগুলো লাতিন আমেরিকাকে গ্রাস করলেও, আমেরিকার মূল ভুখন্ডে মধ্য অষ্টাদশ শতকে গৃহযুদ্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্টা পায়। সে তুলনায় আমাদের ভারত তথা উপমহাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস মাত্র ৭০ বছরের সামান্য বেশি সময়ের। একটা লুণ্ঠিত অশিক্ষিত গরীব জাতিকে দাঁড় করাতে, শিক্ষিত করাতে, মাথার উপরে আস্তানা, দুমুঠো ভাতের যোগান নিশ্চিত করতেই এই সময়টা কোথা দিয়ে চলে গেছে। এর সাথে ছিল নিয়মিত ঘর ও বর্হিশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ। বিশ্বায়নের সাথে পাল্লা দিয়ে এই সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জনগণের হাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করিয়েছে। এই বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, যতটা হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়েছে কী হয়নি, সে প্রশ্ন থাকাটা গণতন্ত্রেরই অঙ্গ।

শুরুর গণতন্ত্রে মহিলা বা দাসেদের কোনো ভোটাধিকার ছিলনা। তথ্যের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেদিনের শুরুর গণতন্ত্রের সাথে আজকের গণতন্ত্রের বিপুল ফারাক রয়েছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেমন অনেক কিছুকেই গণতান্ত্রিক বলতে নারাজ তৎকালীন এ্যসেম্বলির নিয়মকে, ঠিক তেমনি সেদিনের প্রেক্ষাপটে ভাবলে আজকের অনেককিছু যাকে আমরা গণতন্ত্র বলি, সেগুলোকে হাস্যকর পাগলামো মনে হতে বাধ্য। মোদ্দাকথাটা হল গণতন্ত্র হল সেই ব্যবস্থাপনা যা সময়ের সাথে ক্রমশই পরিবর্তনশীল, জনগণ শুধু ধ্রুবক রয়ে গেছে। কিন্তু, বর্তমান যুগে ইজরায়েল-ফিলিস্তিনের নাগরিক সমস্যা হোক বা মায়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা, কিম্বা আমাদের দেশেই NRC এর নামে না-নাগরিকত্ব আইন; এই সবের ফাঁসে জনগণ আড়াআড়ি দুটো ভাগে বিভক্ত- একটা নাগরিক অন্যটা উদ্বাস্তু; বলাই বাহুল্য দ্বিতীয় শ্রেনীটার কাছে গণতন্ত্র সোনার পাথরবাটি। সুতরাং জনগণ মানেই সে গণতন্ত্রের অংশীদার নয়- সে কথা আজকে প্রমাণিত।

অতীতের অনেক দার্শনিকই গণতন্ত্র থেকে আইনব্যাবস্থাকে পৃথিকীকরণের কথা বলেছিলেন, কারন গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপরে। সেখানে রাষ্ট্র, যুক্তি, আইনের গুরুত্ব কখনই ওই সংখ্যাগরিষ্ঠতার উর্ধ্বে যায়না; তেমন বিতর্কিত ক্ষেত্রে ‘রাষ্ট্র’, ‘যুক্তি’ বা ‘আইনের’ সংজ্ঞাই বদলে দেয় সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের দল। গণতন্ত্র বিষয়ক নানা বিষয়ে খোদ এ্যারিস্টটলও বিরুদ্ধ মত পোষণ করলেও, তাঁর মতে গনতন্ত্রই সরকারের শ্রেষ্ঠ রূপ নয়, বরং মনার্কি বা আভিজাত্যবাদ দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষমতাও যদি আইনের পক্ষে শাসন করে যা প্রান্তিক মানুষটিকেও সরকারের সুফল পৌঁছে দেয়, সেটাও গণতন্ত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন আভিজাত্যই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাবার একমাত্র দাবীদার; যে আভিজাত্য বংশানুক্রমে প্রাপ্ত নয়, যেটা সুশিক্ষা ও প্রকৃত জ্ঞানের পরম্পরা বহন করে। এ সব দর্শন তত্ত্বের পরেও গণতন্ত্রকেই তিনি প্রকৃত স্বাধীনতা হিসাবে মানতেন। বহুদলীয় রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতালিপ্সা, অলীক প্রতিশ্রুতি আর দুর্বৃত্তায়ন, পুঁজিবাদের দাসত্ব মনোভাব- গণতন্ত্রকে কোণঠাসা করে দিয়েছে আজকের দিনে। ‘ধনতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাবে গণতন্ত্রকে ঢাল বানিয়ে কিছু জনপ্রতিনিধি একনায়ক শাসকে পরিণত হবে আগামীতে’, এ্যারিস্টটল নিজেই এই বিষয়ে সাবধান করে দিয়েছিলেন সভ্যতাকে।

বিপুল ক্ষমতা ও অর্থের নিয়ন্ত্রক রূপে কোনো গণতান্ত্রিক শাসক যখন পদে আরোহণ করেন, কুক্ষিগত করার রিপুগত তাড়না তাকে লোভী করে তোলে। স্বভাবতই সদাপরিবর্তনশীল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিই হল অবক্ষয়গামী। সুতরাং কতগুলি প্রতিষ্ঠান বা সূচকের মানের উপরে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ধারিত হয় বা গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকে বলা যায়, যেগুলোকে গণতন্ত্রের স্তম্ভ হিসাবে গন্য করা হয়। উন্নততর গণতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের প্রকাশ- এই স্তম্ভগুলোর স্বাস্থ্যের উপরেই নিরুপন হয়। এই পথ বেয়েই প্রতিটি পরিবর্তন পরিবর্তিত হতে থাকে দশকের পর দশকে। গণতন্ত্রের স্তম্ভের বিষয়ে পরবর্তী অধ্যয়ে বিশদে আলোচনা করব, তার আগে বর্তমান পৃথিবীতে কতধরনের গণতন্ত্র আছে সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাতের চেষ্টা করি।

….ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *