গণতন্ত্রঃ মিথ ও আগামী পৃথিবী-২

প্রথম পর্বের ফেসবুক লিঙ্কঃ https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10207080307201903&id=1707681415

দ্বিতীয় পর্ব
^^^^^^^^^^

গণতন্ত্র কতপ্রকারের হতে পারে! গণতন্ত্রের মূলত দুটো মৌলিক প্রভেদ পরিলক্ষিত করেছেন পণ্ডিতেরা। সরকারের গঠনতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বমুলক বিষয়ের উপরে নির্ভর করে; প্রথমটি হল ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’ ও দ্বিতীয়টি হল ‘প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র’। এই নীতির উপরে ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের সংবিধান তথা ‘সরকার ও নাগরিকের’ নিয়মতন্ত্রের গঠনপ্রণালী পঞ্জিকরন নির্দিষ্ট হয়।

‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক বাক্তিকে সরকারের অংশীদার রূপে বিবেচনা করা হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে ভিত্তিকরে জনগণেরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয় ও তারা প্রত্যেকে নির্বাচকের ভূমিকা পালন করে। এই পর্যায়ে বাক্তি ও সরকারের মাঝে কোনো সমন্বয়কারী থাকেনা। প্রাদেশিকতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, লিঙ্গভেদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত বিভিন্নতা ইত্যাদিকে অগ্রাহ্য করে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারন পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে সকলের সমঅধিকার রক্ষিত হয়। তত্ত্বগতভাবে দেখলে মনে হওয়া স্বাভাবিক সে এটাই বোধহয় গণতন্ত্রের আদর্শ রূপ, কিন্তু বাস্তবটা ততটাও নিষ্কলঙ্ক নয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক বিরোধী বলে একটা সম্প্রদায় থাকে যারা সরকারের পরিচালকদের বিভিন্ন ত্রুটিগুলিকে তুলে ধরে ও জনগনকে সেই বিষয়ে জ্ঞাত করে। যদিও বর্তমানে ‘রাজনৈতিক বিরোধী’ বাক্যটা থেকে রাজনৈতিক শব্দটাকে বেমালুম উহ্য করে রেখে শুধুই ‘বিরোধী’ শব্দটা জনপ্রিয় হয়েছে। ফলস্বরুপ বিরোধটা সমাজের সর্বত্র পৌঁছে গেছে, একদম ভাতের হাঁড়ি পর্যন্ত।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য সাওয়াল করতে থাকে মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই। ঐতিহাসিকভাবে কিছু পরম্পরার ক্ষেত্রে দেখা গেছে- ছোট ছোট প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করে যতক্ষননা তারা ক্ষমতায় পৌঁছে বৃহত্তর গোষ্ঠীতে রুপান্তরিত করছে। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের কিছু জনপ্রিয় পন্থা রয়েছে জনগণের কাছে পৌঁছানোর, প্রথমটি হল- যেকোনো জনমোহিনী উদ্যোগের সূচনা ও দ্বিতিয়টি হচ্ছে গণভোট। দুটি পন্থায় হরেক আঙ্গিকে রাষ্ট্রের জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়, ভিন্ন ভিন্ন অভিলাষ ও অভিসন্ধি নিয়ে। এই পদ্ধতি মেনে সংসদ বা এসেম্বলির প্রতিটি অধিবেশনেই সংবিধানের ধারা পর্যন্ত সংশোধিত, পরিবর্তিত, পরিমার্জনা বা অপোনদন করে দেওয়া হয়; যে পরিবর্তন সকল সময় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা নাগরিক সুরক্ষার হিতে থাকেনা। এমন পদ্ধতিতেই ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলগুলি প্রায় প্রতিটিই, জনগণের সার্বজনীন চাহিদার জোট ভাঙতে উপরোক্ত দুই ধরনের পন্থা কৌশলে ব্যবহার করে জনগণের মাঝে বিভাজন ঘটিয়ে দিয়ে থাকে, গোটা বিশ্বে যার উদাহরন ভুঁড়িভুঁড়ি। তা সত্বেও এই প্রত্যক্ষ গনতন্ত্রেই বিক্ষুব্ধ জনগণকে তাদের অপ্রাপ্তির ক্ষোভ মেটাবার সুযোগ দেয় ভোটের বাক্স, পরবর্তী মেয়াদের জন্য সেই সকল রাজনৈতিক দল বা তাদের জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে পারে জনগণই।

এই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র জনগণকে আর শুধু জনগণ না রেখে প্রত্যেককে ‘রাজনৈতিক কর্তৃত্বে’র সর্বক্ষুদ্র একক বানিয়ে তোলে, প্রত্যেককে রাজনৈতিক জ্ঞানের সুযোগ দিয়ে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভাবে সচেতন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসীম ভূমিকা রাখে। নাগরিকদের ইচ্ছা প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্বসহ ও নিরপেক্ষ ভাবে মান্যতা দেওয়ার সাথে, ধর্মীয় কিম্বা রাজনৈতিক মতাদর্শগতভাবে সংখালঘুদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকায় বিষয়টা- প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত; পুঁথিগতভাবে এটা দেখতে নিখুঁত হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা ভীষণ উদ্বেগের, তাই এই ধরনের গনতন্ত্রকে অন্য কোনো পদ্ধতিরই পরিপূরক বলা যায়না।

গণতান্ত্রিক কার্যবিধি গুলো নিরুপন করার দরুন সঠিক কর্মধারা যুক্ত দিশা অধিগ্রহণ করে, নির্বাচিত সরকার জনমুখী আইনের প্রণয়ন করে ও সেগুলোকে বৈধতা দান স্বরূপ গণমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা করে। এই জনমুখী পন্থা গুলো কার্যকর করার কয়েকটি অলিখিত নীতিমালা অনুসরণ করে চলতে হয় ‘প্রত্যক্ষ গনতান্ত্রীক’ রাষ্ট্রগুলিকে। যথা-

i) যেকোনো প্রবর্তনা মূলক উদ্যোগে গণভোটের প্রস্তাবনা আসলে তা কখনই সংসদ বা সরকার নিজে থেকে নিতে গ্রহণ করতে পারবেনা, নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে তাদের প্রতেকের মতামত নিতে। কিন্তু এর সমস্যা হল, কতদিন অন্তর কতবার জনসাধারনের কাছে রাষ্ট্র এই ভোটের প্রস্তাবনা দেবে সেটা বড় জটিলতা যুক্ত বিষয়, রাজনৈতিক দলগুলি কখনই জনগণের কাছে নিজেদের উন্মুক্ত না করে একটা অপরিচ্ছন্ন ধোঁয়াশা রেখে দেয়। স্বভাবতই জনগন সরকারকে নিয়ন্ত্রণের বদলে সরকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে- তারা কি করবে, কি খাবে, কি বলবে। এই অসামঞ্জস্যতা প্রশ্ন তুলে দেয়, আসলে তাহলে কে সার্বভৌম- নাগরিক না তাদের দ্বারা নির্বাচিত সরকার!

ii) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব আসলে ভোটারের সংখ্যার উপরে ন্যাস্ত থাকে, সুতরাং সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধমত পোষণ করার পুর্ণ স্বাধীনতা থাকবে কিম্বা সেই সিদ্ধান্তকে আরো কীভাবে উন্নততর করা যার সে বিষয়ে মতামত জাহির করতেই পারে যে কোনো নাগরিক। বিশিষ্ট জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী জুরগেন হাবের্মাস এর মতে- ‘রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত ভোট প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রের অন্তিম নির্নায়ক পদ্ধতি নয়, বরং নিয়মিত আলাপ আলোচনার মাঝে জনগণকে প্রত্যক্ষ ভাবে সংযুক্তিকরনের মাঝেই সর্বোৎকৃষ্ট ফলাফল পাওয়া সম্ভব’। এক্ষেত্রে ভোটারকে যতক্ষণনা তার ভোটগত সিদ্ধান্তের পক্ষে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে, ততক্ষণ পর্যন্ত মতদানের গুরুত্বকে খাটো করে দেওয়া হয়। সকলসময়েই রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা সাধারন জনগণের কাছে বিভ্রান্তিকর বিষয়, তা স্বত্বেও বর্তমান ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে রাজনীতির সাথে প্রায় সমার্থক করে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতি হল ক্ষমতায়নের যন্ত্র- ক্ষমতা বন্টনের নয়; রাজতন্ত্রেও রাজনীতি থাকে সুতরাং রাজনীতি মানেই গণতন্ত্র নয়। কিন্তু গণতন্ত্র মানে অধিকার বুঝে নেওয়া, রাজনীতিতে এ কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে, ক্ষমতার সমবন্টন হয় যোগ্যোতা অনুয়ায়ী।

iii) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এমন একটি হাতিয়ার যার দ্বারা প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের উন্নতির সুষম বন্টন ও ভোগ করতে সক্ষম। সেটার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সমিতি গঠন করে প্রত্যক্ষ ভাবে জনগণকে পরিচালন পর্ষদে অন্তর্ভুক্তি করতে হয়। এতে করে তৃনমূল স্তরের জনগণ যেমন রাজনীতির উপকরণ গুলির সাথে পরিচিত হয়, তেমন অনুশীলিত হওয়ারও সুযোগ মেলে; যেমন পঞ্চায়েত বা পৌরসভা। যেকোনো নীতির পরীক্ষাগার হিসাবে এই সকল পরিসর গুলির ভূমিকা অসীম, এখানে নাগরিকের প্রতক্ষ্য ভূমিকা থাকে গণতন্ত্রিক সরকারের প্রশাসন যন্ত্রকে সম্পাদনা করার; যা কেন্দ্রীয় ভাবে রাষ্ট্রকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রত্যয় দান করে।

…ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *