আশার খবরঃ ভ্যাকসিন গবেষণা

নভেল করোনা ভাইরাস SARC-CoV2 তথা COVID-19 এর মারন দাপটে গোটা বিশ্বজুড়ে ত্রাহিত্রাহি রব উঠছে। ভয়ানক ছোঁয়াচে এই রোগ বিশ্বে প্রায় প্রতিটি দেশকে ধরাশায়ী করে দিয়েছে, প্রায় পাঁচমাস যাবৎ এই মারন রোগ বিশ্বকে গ্রাস করে রেখেছে, রোগী পরীক্ষার পর দেখা গেছে প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত ও পৌনে দু’লাখ মানুষ এর বলি হয়েছে, কমবেশি আমাদের সকলের কাছেই এ তথ্য রয়েছে। কিট দ্বারা পরীক্ষার বাইরে পৃথিবীর এই বিপুল জনসংখ্যার কাকে কোথায় যে এই ভাইরাস তার অভিক্রমনে বন্দী করেছে তা কেউই জানেনা। সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে মারণ যজ্ঞ, মৃত্যু ভয় থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে আজ সারা পৃথিবী সকল বিভেদ ভুলে একজোট হয়ে লড়াই করছে। কিন্তু আজ ২১শে এপ্রিল ২০২০, তারিখ পর্যন্ত না সঠিকভাবে এই অদৃশ্য জীবাণুকে সনাক্তের সহজতর প্রণালী আবিষ্কৃত হয়েছে, না আবিষ্কার হয়েছে এই জীবানু কীভাবে সংক্রমণ শানাচ্ছে।

সারা বিশ্বের নিরিখে তথ্য বলছে, প্রতি ১০০ জন করোনা আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৭৯ জনই সুস্থ হয়ে গেছেন। জিব্রালটার, ফকল্যান্ড আইল্যান্ড, ফায়িরো আইল্যান্ড, সানমারিও, বাহারিন ইত্যাদির মত খুব অল্প জনসংখ্যার দেশগুলো ব্যাতিরেকে করোনা আক্রান্ত হয়েছে কি হয়নি এই পরীক্ষার নিরিখে আইসল্যান্ড সবচেয়ে আগে রয়েছে, তারপরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তৃতীয় স্থানে ইজরায়েল। আমেরিকা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করেছে, সংখ্যাটা চল্লিশ লক্ষের কিছু বেশি; যদিও সেটা শতাংশের হিসাবে সেটা ১ জনের একটু বেশি। আমেরিকার পর পরীক্ষার বিষয়ে এগিয়ে আছে রাশিয়া, জার্মানি ও ইতালি। চীন কি করেছে সেটা তারা ছাড়া কেউ জানেনা, তাই সঠিক তথ্য কারো কাছেই নেই। সবচেয়ে মৃত্যুহার বেশি ইংল্যান্ডে, সেখানে সুস্থ হয়ে ওঠার হারও অত্যন্ত কম। অসমর্থিত সূত্রমতে ভারতে মোট করোনা টেষ্ট হয়েছে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার লক্ষের সামান্য বেশি মানুষের, মানে প্রতি সাড়ে তিন হাজার মানুষের মধ্যে একজনের। বাকি ৩৪৯৯ জনের মধ্যে কে আক্রান্ত কেউ জানেনা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, মরলেও করোনা হয়ে কিনা জানার আগেই হয়ত দেহ লীন হয়ে যাচ্ছে। এত বড় দেশের একটা বিধানসভার সমান জনসংখ্যাকে (ভোটার নয়) কোনো রকমে স্পর্শ করতে পেরেছে, এখনও ৪১২০টা বিধানসভা বাকি। নাগরিকদের তরফ থেকে সরকারের কাছে দাবী করা উচিৎ- প্রতিদিন কতজনের টেষ্ট হচ্ছে এটা যেন নিয়মিত ঘোষণা করে ICMR বা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক।

এর মুহুর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন এই ভাইরাসের মোকাবিলার জন্য অস্ত্র তথা ভ্যকসিন বা টিকার আবিষ্কার করা। যদিও কেউ নিশ্চিত করে বলতে সক্ষম হচ্ছেননা যে ঠিক কবে নাগাদ এই রোগের প্রতিষেধক বাজারজাত করা সম্ভব। সমগ্র সভ্যতা আজ প্রায় গৃহবন্দী জীবন যাপন করলেও একটা শ্রেনীর মানুষ কিন্তু তাদের নিরলস মেধা ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন সভ্যতাকে রক্ষা করতে। তারা বিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্লেষক, অধাপকদের দল; যাদের পিছনে লগ্নি করে চলেছে বিভিন্ন রাষ্ট্র, ওষুধ কোম্পানী, সংগঠন, ও হরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতিপূর্বে কখনও গোটা বিশ্বজুড়ে থাকা বিজ্ঞানীরা এইরকম আপদকালীন সময়ে জরুরী ভিত্তিতে একই বিষয়ে, এই মাত্রার গবেষণা করেননি; সেদিক থেকে এটা নিজেই একটা ইতিহাস। চলুন আজকে তেমনই কিছু গবেষক, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের বিষয়ে একটু জেনে নিই এই অবসরে।

ফরিদাবাদের ‘ট্রান্সলেশানাল হেলথ সাইন্স এন্ড ট্যেকনোলজি ইন্সটিটিউট’ এর এক কর্মকর্তা গগনদীপ কাং এর বিবৃতি অনুয়ায়ী এই মুহুর্তে ভারতে ৬টি কোম্পানী সরাসরি করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন ‘ডেভলপিং’ এর কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে গুজরাটের ‘জাইডাস কাডিলা’ দুটো ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে, বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান একটি করে ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে। সেগুলো হল- পুনের ‘সিরাম ইন্সটিটিউট’, হায়দ্রাবাদের ‘বায়োলজিকাল ই’, ‘ভারত বায়োটেক’, ইন্ডিয়ান ইমিউনোলজিক্যাল’, এবং ব্যাঙ্গালুরুর ‘মিনভ্যাক্স’ কোম্পানী গুলি। কেরালার রাজীবগান্ধী বায়োট্যেকনোলজির মুখ্য বিজ্ঞানী শ্রীকুমারবাবু জানিয়েছেন- “এই ভ্যাকসিক ডেভলপ হওয়া একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, প্রথমেই এগুলো মানুষের উপরে ব্যবহার করা হয়না; ক্লিনিক্যালি হরেক পর্যায়ের পরে, পরীক্ষাগারে বিভিন্ন ধরনের জীবজন্তুর উপরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়ে তারপর মানুষের উপরে প্রয়োগ হয়, যা কমপক্ষে এক থেকে দেড় বছরের সময়রেখাকে নির্দেশ করে”।

সুতরাং বোঝায় যাচ্ছে পৃথিবীর সকল ধরনের মানুষের জন্য সহজলভ্য ভ্যাকসিন বানানোটা সকলসময়ই একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিল গেটস এর ফাউন্ডেশনের অর্থে পুষ্ট- নরওয়ের অসলো শহরে অবস্থিত ‘কোপিশন ফর এপিডেমিক প্রিপারেডনেস ইনোভেশনস’ (CPIC) করোনা গবেষণা বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞানীদের মাঝে আন্তঃ সংযোগস্থাপন, ইত্যাদি- হরেক ভাবে বিজ্ঞানকে পুষ্ট করে চলেছে। তাদের তথ্য মতে, এই মুহুর্তে বিশ্বে ১১৫টি সংস্থা করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে, যাদের মধ্যে ৭৮জন এখনও চালিয়ে যাচ্ছে, বাকি ৩৭ টি কোম্পানী পরবর্তীতে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি শুরুর পর। এর মধ্যে ভারত থেকে মাত্র দুটো কোম্পানীর গবেষণাকে বিশ্বসংস্থা গুলি স্বীকৃতি দিয়েছে, যথাক্রমে জাইডাস কাডিলা ও সিরাম ইন্সিটিটিউট।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য মোতাবেক ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত তিনটে সংস্থা মানবদেহে এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে, যদিও তা এক্কেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। এছাড়া আরো প্রায় ৭০টি মত সংস্থা এমন আছে যারা ল্যাবরেটরি পর্যায়ে রয়েছে বা জন্তু জানোয়ারের উপরে প্রয়োগ পর্যন্ত অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছে। ‘হু’ এর অধিকর্তা প্রতিটি রাষ্ট্রনেতাদের কাছেই আহ্বান করেছেন যে, যখনই এই ভ্যাকসিন বাজারে আসুক তা যেন শুধু মাত্র অর্থনৈতিক সমর্থ মানুষদের জন্য বা নির্দিষ্ট কোনো ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের জন্য না হয়; প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহায়হীন মানুষটিও যেন এই আবিষ্কারের লাভ নিতে পারে।

বিশ্বের অন্যত্র নজর রাখলে দেখা যাবে, অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন G-20 দেশগুলির কাছে যৌথ তহবিল গঠন করার আবেদন জানিয়েছে, যাতে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক ও এন্টি-ভাইরাল ওষুধ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য দ্রুত আর্থিক ও পরিকাঠামোগত বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যায়। কয়েকদিন পূর্বেই তাদের জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা জানিয়েছে- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বানানো একধরনের ভ্যাকসিন তারাও কিছু আক্রান্ত নাগরিকদের উপরে প্রয়োগ করেছে।

ডাউনিং স্ট্রীটের সূত্রানুসারে, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায়- গবেষনাসংক্রান্ত খাতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ লগ্নি করেছে গ্রেট ব্রিটেন, পরিমাণটা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। G-20 দেশ গুলির নেতা হিসাবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিশ জনসন ঘোষণা করেছেন যে- ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলেই তারা সর্ব নিন্মমূল্যে সেটিকে বাজারজাত করবে, যাতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বিজ্ঞানের লাভ পায়। এদিকে মার্কিন সরকার তাদের দেশজ কোম্পানী গুলোকে উৎসাহিত করতে বিপুল অঙ্কের পুরষ্কারের ঘোষণা করেছে, যারা করোনার ভ্যাকসিন সর্বপ্রথম আবিষ্কার করতে পারবে। যদিও ‘মেক ইন আমেরিকা’ শ্লোগানের উন্নাসিকতা রয়েছে তাদের অনেক কর্মেই, তবুও দিনের শেষে একটা সমাধান আসাটাই বড় কথা। শুধু সরকারই নয়, তাদের দেশের বিখ্যাত কোম্পানী ‘জনসন এন্ড জনসন’ বিপুল আর্থিক পুরষ্কারের কথা ঘোষণা করেছে।

CNBC সংবাদ সংস্থার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ‘হু’ জানিয়েছে- ‘জিন সিকোয়ান্সিং’ নিয়ে কাজ শুরু করার মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে মানবশরীরে প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছানটাই একটা বিশাল সাফল্য গোটা বিশ্বের কাছে। ‘হু’ এর জরুরী কার্যক্রম বিভাগের পরিচালক ডাঃ মাইক রায়ানের মতে- ভাইরাস মানুষের জন্য যতটা ক্ষতিকর, একটা ভুল ভ্যাকসিন তারচেয়ে আরো বেশি ভয়ানক। কারন বহু আক্রান্ত মানুষ নিজ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার গুনেই সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষমা রাখেন, যেখানে ভুল ভ্যাকসিন দেওয়া মানেই মৃত্যু অবধারিত। এদিকে এই ভ্যাকসিন সারা বিশ্বের মানুষের জন্যই অতিপ্রয়োজনীয় আজকের পরিস্থিতিত, তাই এখানে তাড়াহুড়োর কোনো জাইগা নেই।

আমেরিকার সিয়াটেলস্থিত ‘মডারনা থেরাপিউটিকস’ নামের এক বায়োটেক সংস্থা করোনা ভাইরাসের ‘জিনগত বিন্যাসক্রম’ সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করেছে, যেখান থেকে আগামীতে এই ভাইরাসের আণবিক গঠন থেকে সংক্রমণের পদ্ধতি ও পরিবেশের সাথে দ্রুত পরিব্যাপ্তির বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থমন্ত্রকের তথ্য অনুয়ায়ী উপরোক্ত সংস্থার তৈরি ভ্যাকসিন mRNA, ১৮-৫৫ বছর বয়সী ৪৫ জন- ‘পুরুষ ও গর্ভবতী নয় এমন মহিলাদের’ শরীরে প্রয়োগ করে ভ্যাকসিন ডেভলপের প্রাথমিক দশা সাফল্যের সাথে অতিক্রম করেছে। ঠিক একই ধরনের পরীক্ষা চালিয়েছে ফিলাডেলফিয়ার ‘ইনোভো ফার্মা’ সংস্থা, INO-4800 নামের ভ্যাকসিন ৪০ জন রোগীর দেহে পরীক্ষামূলক ভাবে প্রয়োগ করেছে। আমেরিকারই ‘জন হপকিন্স’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক নিরন্তর তথ্য বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন, এই ভাইরাসের সংক্রমণের গানিতিক গতিপ্রকৃতি নিরুপনের জন্য।

চীনের উহান প্রদেশে এই করোনা ভাইরাসের প্রকোপ সর্বপ্রথম লক্ষ্য করা গেছিল। তাদের গবেষণা সম্বন্ধে খুব বেশি জানতে পারেনা বাকি বিশ্ব, তবে তাদের কমিউনিস্ট সরকার একটা ‘ডেটাবেস’ প্রকাশ করেছে বিজ্ঞানীদের জন্য, যাতে করে বিশ্বজুড়ে ছিটিয়ে থাকা গবেষকেরা উপকৃত হন। চীনের সরকারী সংবাদপত্র সিনহুয়া’র দাবী অনুযায়ী তাদের সেনাবাহিনীর ‘ইন্সটিটিউট অফ মিলিটারি মেডিসিন’, মানব শরীরে তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে গত ১২ই এপ্রিল। এছাড়া ‘কানসিনো বায়ো’ নামের এক ওষুধ কোম্পানী Ad5-nCoV নামের ভ্যাকসিন মানব দেহে প্রয়োগ করেছে, সেনঝেন প্রদেশের ‘জেনো-ইমিউন মেডিকেল ইনস্টিটিউট’ আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত গবেষণা চালাচ্ছে LV-SMENP-DC নামের করোনা ভ্যাকসিনের উপরে।

Adenovirus 26 (Ad26) নামের গবেষণাগারটি এইডস ভাইরাস, সিন্সিটিয়াল ভাইরাস, ইবোলা ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, ইত্যাদির ভ্যাকসিনের সফল গবেষণা করেছিল; এটি জনসন এন্ড জনসন কোম্পানীর অধীনস্ত ‘জেন্সসেন ফার্মা’র নিয়ন্ত্রাধীন। এরাও কোভিড ভাইরাসের জিনগত প্রোটিনের উপরে গবেষণা করে প্রাথমিক সাফল্য লাভ করেছে। তাদের বিজ্ঞানী দলের মুখ্য কর্মকর্তা ‘পল স্টোফেলস’ এর বিবৃতি অনুযায়ী- “পৃথিবী কবে করোনার ভ্যাকসিন পাবে তা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে, কারন গবেষণার সমস্ত শর্তগুলো বিজ্ঞানীদের নিয়ন্ত্রাধীন নয়। এবং এই ভাইরাসটি সম্বন্ধে কারো কাছেই কোনো তথ্য ছিলনা, তাই সকল বিজ্ঞানীদের শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। তবে আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুতই বিশ্বকে আমরা সুসংবাদ দিতে পারব’। প্রসঙ্গত জনসন এন্ড জনসন কোম্পানীটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানী। পর্যায়ক্রমে বিশ্বের ১ থেকে ১০ নং ওষুধ কোম্পানী গুলি মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাদের করোনা গবেষণাকে একটা সম্পূরক রূপ দিতে, যথাক্রমে- ফাইজার, রোচে, নোভার্তিস, মার্ক, গ্ল্যাক্সো-স্মিথ-ক্লিন, জনসন এন্ড জনসন, আবভাই, সানোফি ও ব্রিস্টল-মেয়ার্স-স্কুইবি। এর বাইরেও বহু গবেষক আড়ালেই কাজ করে চলেছেন, যার তথ্য নেই।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল, চীনের জিজিং হাসপাতাল, এবং উত্তর ইতালির একজোড়া হাসপাতালে একত্রে- ‘হার্ভার্ড’ এর একদল গবেষকেরা করোনভাইরাস রোগীদের উপর ‘ইনহেলড নাইট্রিক অক্সাইডে’র কার্যকারিতা বিষয়ক পরীক্ষা চালাচ্ছে। medRxiv ও bioRxiv নামের দুটি অনলাইন সার্ভারের অর্কাইভে, করোনা রোগীদের সম্পর্কিত প্রচুর সঞ্চিত তথ্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন চীনা গবেষক ও বিজ্ঞানীরা। অথচ এগুলো কোনো যে গবেষকের ক্ষেত্রে বিশাল সম্মান ও অর্থ রোজগারের কারন হতে পারত, কিন্তু বিশ্বের জনগণের স্বার্থে চীনা বিজ্ঞানীরাও নিঃস্বার্থ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

সারা বিশ্বজুড়ে অক্সফোর্ডের ‘জেনার ইন্সটিটিউট’, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকুলার বায়োলজি গবেষণা কেন্দ্র, আমেরিকার ‘কাইজার পার্মানেট’ সহ অনেকেই এই কর্মে ব্রতী। ইতালির করোনাভাইরাস ক্লিনিকাল ট্রায়ালের নেতৃত্ব দানকারী ডঃ ফ্রান্সেস্কো পেরোন বলেছেন- “গবেষকরা কয়েক’শ করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স সনাক্ত করে সেগুলো বিভিন্ন ভাগে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। দ্রুতই আমরা সফল হব”। রাশিয়ার পিটসবার্গের ‘ডাঃ ডুপ্রেক্স ল্যাব’, প্যারিসের ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’, ফরাসি জনস্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র ‘ইনসার্ম’, ইতালির ‘ইমিউনোসপ্রেসিভ ড্রাগ টোকিলিজুমাব’, অস্ট্রিয়ান ড্রাগ সংস্থা ‘থেমিস বায়োসায়েন্স’, কানাডার ‘ন্যাশানাল ল্যাব’, মন্টানার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথের ‘রকি মাউন্টেন ল্যাবরেটরি’, ইরানের উর্মিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রমুখ প্রতিষ্ঠানেও নিরবিচ্ছিন্নভাবে করোনা মহামারির প্রতিষেধকের খোঁজে সাধনা চালাচ্ছে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ উন্নতি ঘটিয়েছে ইজরায়েল। তাদের দেশের বহুল প্রচলিত নিউজ পোর্টাল ‘Ynet’ জানিয়েছে যে- ইজরায়েল সেনাবাহিনী চীন, জাপান, ইতালি, ব্রাজিল, আমেরিকা, ভারত সহ অন্তত ১০০ টি দেশ থেকে করোনাক্রান্ত মৃত মানুষের নমুনা যোগার করেছে। যেগুলো তাদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সহযোগিতায়, দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নিজস্ব কুরিয়ারে, মাইনাস ৮০ ডিগ্রী তাপমাত্রার বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত প্যাকেটে করে দেশের মুল গবেষণা কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছে মৃতের নমুনা গুলি। সে দেশের জনপ্রিয় সংবাদ পত্র ‘হারিৎজ’ এর বয়ানে অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তত্ত্ববধানে থাকা ‘ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিকাল রিসার্চ’-এর প্রায় ৩০০ বিজ্ঞানীদের দল, নেস জিজিয়ানা শহরের ল্যাবোটারিতে ভাইরাসটির জৈবিক প্রক্রিয়া এবং চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে বাকিদের তুলনাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছ। এর মধ্যে রয়েছে আরো ভাল করে শারীরিক লক্ষণ দেখে রোগনির্নয় ক্ষমতা, সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব কমানো, মানবদেহের মাঝে উপস্থিত করোনা প্রতিরোধে সক্ষম এন্টিবডিগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে তাকে কীভাবে আরো শক্তি প্রদান করা যায়, সেই সংক্রান্ত গবেষনাও রয়েছে যেগুলো অস্থিমজ্জা ও জিনগত মডিউল বিশ্লেষণ করে পাওয়া। বিতর্কিত এক এক মাধ্যমের মতে, গ্যালিলি অঞ্চলের একটি ল্যাবে বেশ কিছু ফিলিস্তিনি ও সিরিয়ান উদ্বাস্তুদের দেহে তৃতীয় পর্যায়ের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে ইজরায়েল সরকার। চীনের মত না হলেও সে দেশের গোপনীয়তা সবচেয়ে নিশ্চিদ্র। সময়ই বলবে কোন গবেষকের দল সভ্যতার হয়ে বাজি জিতল।

এই হল মোটামুটি বিগত ১ মাস যাবৎ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পড়ার ফলাফল, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য কোথাও কোনো বিজ্ঞানীকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনিনকে করোনার ওষুধ বলে ব্যবহারের নিদান দিয়ে বলে পড়লামনা। তাহলে এগুলো হচ্ছেটা কি আর এ নিয়ে আমাদের দেশ জুড়ে আলোড়নই বা উঠল কেন! এ প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে থাকলে দয়া করে বলবেন।
________________________________
সম্পাদনা ও প্রবন্ধাকারে রচনাঃ তন্ময় হক
২১/০৪/২০২০

তথ্যসুত্রঃ-
ইকোনোমিক টাইমস ওয়েব পোর্টাল
নিউ ইয়র্ক টাইমস পোর্টাল
দ্য গার্ডিয়ান ওয়েব পোর্টাল
সি এন বি সি পোর্টাল
সায়েন্স ম্যাগাজিন পোর্টাল


Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *