সরকারকে কেন অনুদান দেবেন?

দৃশ্য ১- ধরুন, আপনারা আমাকে একটা চাকরি দিয়েছেন। আপনাদের নিজ রোজগার থেকে আমাকে কিছু কিছু দেন যাতে আমি ও আমার দলবল আপনাদের সকলকে সু-পরিষেবা দিই। এখন সেই টাকা নিয়ে আমি বেড়াতে যাচ্ছি, বাপের স্ট্যাচু বানাচ্ছি, উৎসব ফুর্তি করছি, আমার চামচাদের মাঝে বিলিবন্টন করছি ইত্যাদি। এসব দেখেশুনে আপনারা অধিকাংশ লোক আমাকে মানা করেছেন পইপই করে, যে- “ওরে তুই ওই সব উল্টাপাল্টা খর্চা করিসনা, বিপদে পরবি” ইত্যাদি। সেদিন আপনাদের সকলকে ভাগ ‘চারঅক্ষরের বোকা’ বলে নাকের সিকনির মত ছুড়ে ফেলেছিলাম ধুলোতে।

দৃশ্য ২- আমি ভীষণ অসুস্থ, বাইরে বের হবার শক্তি নেই। টাকা নেই- খাবার নেই, পরিবেষা দেওয়ার মুরোদ নেই যার জন্য আপনারা আমাকে চাকরিতে বহাল করেছিলেন। এখন আমি আবার আমি কাতরভাবে চাইছি- ‘বাবু কিছু দান করুন, আপনার ভাল হবে’।

প্রশ্নঃ দেবেন আপনি?

সুতরাং, কেন আমার রোজগারের অর্থ সরকারকে অনুদান দেব?

সরকারের কাজ ট্যাক্স সংগ্রহ করে জনগণকে উন্নততম পরিসেবা দেওয়া। প্রতিটি সংসারেই কিছু উদ্বৃত্ত সম্পদ বা অর্থ, দুর্দিনের জন্য গচ্ছিত রাখা থাকে, সরকারও একটা বড় সংসার বই অন্য কিছু নয়। কিন্তু আমাদের কেন্দ্র সরকার হোক বা রাজ্যসরকার, আজকের দিনে হোক বা বিগত ইতিহাসে- “সরকারী মাল, দরিয়াতে ঢাল” হিসাবে যা ইচ্ছা তাই করেছে।

• সরকার আমাদের অর্থ দিয়ে কী করেছে? স্ট্যাচু বানিয়েছে। সেটা মায়াবতীর আমলে হাতি বা নিজের ঢাউস মুর্তিই হোক বা আজকের ‘শিবাজীর’ মুর্তি, ‘স্ট্যচু অফ ইউনিটি’, প্রস্তাবিত রামের মুর্তি সহ এমন অনেক প্রোজেক্ট।

• সরকার কি করেছে? প্রাধান সেবকের ঘনিষ্ট কিছু দুষ্কৃতি ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে দেশের সম্পদ লুঠ করেছে। লুঠেরাদের লুণ্ঠিত সম্পদের খতিয়ান খাতা থেকে মুছে দিয়েছে সরকার। জনগণের করের টাকা দিয়ে ঋণখেলাপিদের ভর্তুকি দিয়েছে সমপরিমাণে।

• সরকার কি করেছে? বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাড়িয়েছে, কমলে ‘হা হতোস্মি’। এখন ২৫ টাকার পেট্রোল ৭৫ টাকায় কিনতে বাধ্য করছে সরকার।

• সরকার কি করেছে? রাম মন্দির বানাচ্ছে, কুম্ভমেলার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করেছে, হজ্বের জন্য আর্থিক ভর্তুকি দিয়ে এসেছে, দিল্লি সরকার আবার তীর্থে নিয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রের তো ধর্মীয় পরিচয় নেই, তাহলে ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সরকার কেন অফেরৎযোগ্য লগ্নি করবে? তাও সরকার এটাই করেছে।

• সরকার কি করেছে? কখনও পাকিস্তান, কখনও চীন বা কখনও অন্য কিছুর জুজু দেখিয়েছে। কোটি কোটি টাকা দিয়ে যুদ্ধান্ত্র কিনেছে, যেখানে কফিন কেলেঙ্কারি, বোফর্স কেলেঙ্কারি থেকে আধুনা রাফাল কেলেঙ্কারি ও করোনা কিট কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে। চোরছ্যাঁচড় নিকৃষ্ট ”নেতা আমলারা সরকারের টাকা আত্মসাৎ করেছে।

• সরকার কি করেছে? কয়লা কেলেঙ্কারি, টু’জি কেলেঙ্কারি, ব্যাপম কেলেঙ্কারি, সারদা কেলেঙ্কারি, নারদা কেলেঙ্কারি, নোটবন্দি কেলেঙ্কারি, ইলেকট্রোরাল বন্ড কেলেঙ্কারি, খনি কেলেঙ্কারি, পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি, বাঙ্কর‍্যাপ্ট কেলেঙ্কারির মত অজস্র অপরাধকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে সরকারী অর্থ ব্যায়ে।

• সরকার কি করেছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে কব্জায় করতে অশান্তি করেছে রাজনৈতিক দলদাসেরা, প্রশাসন-সরকার অন্ধ নির্বিকার থেকেছে দোষীদের শাস্তি দিতে।

• সরকার কি করেছে? আইন ব্যবস্থাকে কাঠের পুতুল বানিয়েছে, মিডিয়াকে দলদাস বানিয়েছে।

• সরকার কি করেছে? জনপ্রতিনিধিদের অনৈতিক বিপুল সুযোগসুবিধা দিয়েছে ব্রিটিস লেগাসি মেনে, তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়েছে। সারা জীবনের পেনশনের ব্যবস্থা দিয়েছে। আপনি সেই তেলিই রয়ে গেছেন।

• সরকার কি করেছে? পয়সা দিয়ে ওয়াইসি বা মেহবুবা মুফতিদের পেলেছে। দাঙ্গাবাজ কপিল মিশ্র, ইদ্রিস আলীদের সুরক্ষা দিয়েছে। অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরী, সম্বিৎ পাত্র, ঘন্টাখানেক সুমন, দেব নারায়নেদের, শাঁওলি-অপর্ণাদের মত উমেদার চামচা পালন করেছে।

• সরকার কি করেছে? ‘মন কি বাত’ শুনিয়েছে। ‘কড়ি নিন্দা’ করেছে, ‘ক্রনোলজি’ বুঝিয়েছে, ‘গুন্ডা কন্ট্রোল’ করেছে, ‘উন্নয়নকে’ রাস্তায় দাঁড় করিয়েছে, ‘সব্জি বাজারে গণ্ডি’ কেটেছে, ‘থালা বাজাতে’ বলেছে, ‘হিন্দু-মুসলমান’ চিনিয়েছে, একজন করে ভীষণ ‘অপমানবোধ সম্পন্ন’ রাজ্যপাল পাঠিয়েছে।

• সরকার কি করেছে? প্রধানমন্ত্রীকে গোটা বিশ্বভ্রমন করিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীকেও গোটা বিশ্ব না হলেও বহু স্থানেই ঘুরে নিয়েছেন সরকারী অর্থে, যার কোনো সুফল দেশ বা রাজ্য পায়নি।।

• সরকার কি করেছে? প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীদের আগামীর চেয়ার সুরক্ষিত করার জন্য- সরকারী প্রচারের বাহানাতে নিজেদের মুখের বিজ্ঞাপন দিয়েছে।

• সরকার কি করেছে? নমস্তে ট্রাম্প থেকে রাজ্যের শিল্প সম্মেলনের নামে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার শ্রাদ্ধ করেছে।

• সরকার কি করেছে? আমাদের দেশত্ববোধক ভক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা ভোটের প্রচার করেছে, সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। কখনও সেনার নামে কখনও দেশমাতার নামে।

• সরকার কি করেছে? লুটিয়েন দিল্লি বানিয়েছিল, এখন সেন্ট্রাল ভিস্তার নামে কোটি কোটি টাকার নয়ছয় শুরু করেছে। বুলেট ট্রেনের নামে কোটি কোটির প্রোজেক্ট বানিয়ে সেগুলোকে বাতিল কাগজের ঝুড়িতে ফেলেছে।

• সরকার কি করেছে? উৎসব, মেলা, খেলা, সরকারি কমিটির প্রধান, ইমামভাতা, ক্লাবের নামে সরকারী সম্পদ দেদার বিলিয়েছে।

• সরকার কি করেছে? নির্বোধ ভাঁড়কে বুদ্ধিজীবী বানিয়ে পুষেছে।

• সরকার কি করেছে? ‘আইনকে আইনের পথে’ নির্বিকার ও বিচারহীনভাবে শত শত বছর ধরে চরকি পাকে চলার জন্য পথ বানিয়েছে।

• সরকার কি করেছে? কেউ বিপরীত মত বললেই তাকে রাষ্ট্রের শত্রু বানিয়ে গারদে ভরেছে।

• সরকার কি করেছে? ক্ষমতাসীন দল যেন আজীবন ক্ষমতায় থাকে সেই প্রচেষ্টা করেছে।

এভাবে লিখতে থাকলে তালিকা চিত্রগুপ্তের ফর্দ হয়ে যাবে।

যেগুলো করার ছিল সেগুলো করেনি, বা করলেও তার শম্বুক গতি। আর কি কি করেছে তার একটা ছোট্ট তালিকা তো উপরে দিলাম।

এসবের পর অতি নির্লজ্জ না হলে, কেউ আবার কীকরে সাহায্য বা অনুদান চাইতে পারে?

উপরোক্ত সবেতেই বিপুল পরিমাণে ‘সরকারী অর্থ খরচা’ হয়, যার অধিকাংশ বরাদ্দই সাইফন হয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেই ফিরে আসে। তখন তারা-

*নির্বাচনী প্রচারে দেদার খরচা করে ভোট কেনে।
*ফাইভস্টার পার্টি অফিস বানায়।
*সরকার গঠনে MLA/MP কেনাবেচা করে।
*ভোটের সংঘর্ষের জন্য বোমা বারুদ মস্তান কেনে।
*বিরোধী রাজনৈতিক দলকে শায়েস্তা করতে এই ‘টাকা লিঙ্গ’ দিয়ে গণতন্ত্রকে ধর্ষণ করে।
*নেতারা বৌ-ছেলের নামে বড় বড় কোম্পানি কেনে, বাড়ি কেনে, গাড়ি কেনে,
*সুইস ব্যাঙ্কে একাউন্ট খোলে, বিদেশ ভ্রমণে যায়।
*উদ্ধত নেতার বিদেশী বৌ এয়ারপোর্টে সোনা পাচার করতে গিয়ে ধরাও পরে।

রাজনৈতিক দলগুলো কি দিয়েছে জানেন- কিছু উন্মাদ দিয়েছে।

এত সব কিছু বললাম- ‘সরকার কি দিয়েছে’, কিন্তু সরকার কি দেয়নি জানেন? শিক্ষিত, প্রাজ্ঞ, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা জনদরদি নেতা আমাদের দিইনি সরকার। সরকার ক্ষমতাসীনেদের হয়, আর ক্ষমতার কাছে সকলকিছুই পদানত, যদু গেলে মধু আসে- রাষ্ট্রের সার্বভৌম জনগণ সেই ‘চারঅক্ষরের বোকা’ হয়েই রয়ে যায়।

ভেবে দেখুন তো- না পাড়ার নেতা, না পঞ্চায়েত-পুরসভায়, না রাজ্যস্তরে, না কেন্দ্রীয় স্তরে, না রাষ্ট্র নেতা- না বিরোধী দলনেতা। এমন কোন একজন কি আছে, যাকে এই মুহুর্তে পাতে দেওয়ার যোগ্য!

সরকারকে দান দেবেননা সে কথা বলার এক্তিয়ার আমার নেই, দেশদ্রোহী তকমা জুটে যেতে পারে। তার পরেও বলব- দান যদি করতেই হয়, আপনার প্রতিবেশীটিকে করুন যিনি দৃশ্যতই সহায়হীন, গরীব আত্মীয়কে করুন। কারন চুরিচামারির পর রাষ্ট্রীয় ত্রানের যেটুকু পাব্লিকের কাছে পৌছায় তাতে গলাও ভেজেনা।

অনুদান দিন বেসরকারী গোষ্ঠী গুলোকে যারা রেজিস্টার সংস্থা, কিম্বা রেজিস্টার্ড না হলেও যারা বাজারে সৎ হিসাবে নিজেদের প্রমান করেছেন।

দান করুন গুরুদ্বারে লঙ্গরখানায়, মন্দিরের ভোগ বাবদ, মাদ্রাসার খাদ্য খাতে- এখানে কোনো আম্বানি, বিল গেটস বা সৌদির যুবরাজ খেতে আসেনা। সঙ্কটের সময়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে আপনার দান দিন উজার করে যতটা আপনার সামর্থ্য।

তাদের দিন যারা কমিউনিটি কিচেন চালাচ্ছে। পাড়ার ‘আমরা কজন যুবক সঙ্ঘ’ কে দান দিন, তারা চুরি করবেনা, বিদেশে পাচার করবেনা, মুর্তি বানাবেনা, বোমা কিনবেনা।

দান করুন, দানই হল মানুষের মহত্তম গুণ; তবে অপাত্রে নয়।

©তন্ময় হক

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *