গণতন্ত্রঃ মিথ ও আগামীর পৃথিবী-৩

তৃতীয় পর্ব
°°°°°°°°°°°

(৩)

iv) গনভোট বা প্রবর্তনা জাতীয় মৌলিক বিষয়গুলি কখনই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে আলচোনার জন্য উন্মুক্ত তথা উত্থাপিত হবেনা; এগুলো ধ্রুবক, যা ভোটাধিকার দ্বারা কখনও সংশোধন করা যাবেনা। এগুলো সংবিধানের সেই মৌলিক আইন যা অন্যান্য সাধারণ আইনের চেয়ে উচ্চতর ও নির্বাচিত সংসদদের এক্তিয়ারের বহির্ভুত।

v) ভোটদান প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ, নির্ভেজাল, বিশ্বাসযোগ্য এবং কর্যকরী রাখতে হবে। নাগরিককে এই সংক্রান্ত যাবতীয় সত্যতা ও বৈধতা সংক্রান্ত প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে।

vi) ভোট দ্বারা নির্বাচিত সরকার কতদিনের জন্য ক্ষমতাতে থাকবে সে বিষয়ে জনগণকে সুস্পষ্ট ভাবে নির্দেশনা দিয়ে রাখবে ভোটের আগেই, এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে কোনো ভাবেই তারা আর ক্ষমতাতে থাকতে পারবেনা, পুনরায় ভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছে ফিরে যেতেই হয়। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জনগণ নির্বাচিত সরকারের যে কোনো নীতিকে জনবিরোধী মনে করলে সরকার ভেঙে দিয়ে নতুন করে ভোটের প্রস্তাবনা করতে পারে।

vii) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্টদের স্বৈরাচারী মানসিকতা থেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র ও তার নাগরিককে সুরক্ষিত রাখে। মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের বিকল্প নেই; আর এই সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে হলে ভোট প্রক্রিয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে জনহিত পরিকল্পনায় যে মৌলিক বিরোধ গুলি রয়েছে, সেগুলি সম্বন্ধে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হয়।

viii) ভোটপরবর্তী সরকার গঠন হতে পরবর্তী ভোটের আগে পর্যন্ত সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, বিরুদ্ধ মতাদর্শী জনগণকে হানি না পৌঁছিয়ে। বৈধ যুক্তির অধিকারী জনগণকে- সরকারকে প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতায়ন বিষয়ে সুনিশ্চিত করতে হয় ও একে দ্বন্দ্বযুক্ত মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। এর মাধ্যমেই পূর্ব উল্লেখিত মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হয়।

ix) রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো প্রস্তাবনার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাধারী হয়- নির্বাচিত সংসদদের দ্বারা গঠিত কোনো কমিটি, কখনই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল নয়। সেই কমিটি গুলোর আইনি বৈধতা থাকে রাষ্ট্র স্বীকৃত, যা সর্বোতোভাবে রাজনৈতিক স্বার্থ ও পরিচয়ের উর্ধ্বে থাকবে। কিন্তু পররাষ্ট্র বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সমস্ত জনগণের প্রতিনিধি স্বরূপ সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ স্থানীয় প্রতিনিধিদের দ্বারা আপদকালীন কমিটি গঠিন করতে হয়।

সমস্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও গণতন্ত্র বিষয়ক পণ্ডিত, বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতিবিদের একটা অংশ গণভোটের আজকের প্রক্রিয়াকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসাবে ব্যাক্ত করেছেন। আবার আরেকটা দল মনে করেন, রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলি জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া আসলে জনগণের পক্ষেই ঝুঁকিপূর্ণ, যা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপদজনক। কারন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা গুলো আসলে আমলাতন্ত্র এবং সরকারের মুল নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীগুলিতে কেন্দ্রীভূত থেকে যায় ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে’, রাষ্ট্রের যারা আসল কর্তৃপক্ষ- সেই জনগণের হাতে কখনই প্রকৃত ক্ষমতার হস্তান্তর করেনা বা করার উত্সাহও দেয়না, যেটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও শান্তিশৃঙ্খলাতে হরেক সময়ে বিপর্যয়কর পরিণতি ঘটায়। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের আদর্শ উদাহরন হল- সুইজারল্যান্ড।

আমার বিচারে, প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রই একমাত্র সর্বরোগহরা পন্থা নয়, তাই একে ত্রুটিমুক্ত হিসাবে দেখা উচিৎ নয়। তারমানে এই নয় যে জনগণ তার সহজাত সমালোচনার বিষয়বস্তু হিসাবে সরকারকেই বেছে নেবে, বরং সার্বভৌমত্ব বিষয়ে জনগণকে সুস্পষ্টভাবে শিক্ষিত করে তুলে তাকে জানাতে হবে, সার্বভৌমত্ব বিষয়টি আসলে কি! জনগণ, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন যন্ত্র না সরকার- কে এই সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে বা কোথায় কীভাবে এটা অবস্থান করে সে বিষয়েও জনগণকে প্রত্যয়িত করতে পারলে তবে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের লাভ পাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন করা মানুষের সহজাত চরিত্র, কিন্তু ক্ষমতার সামনে তা সকলসময় বিকশিত হয়না; রাষ্ট্রের উচিৎ জনগণকে প্রশ্ন করার বিষয়ে নিয়মিত অনুশীলন করিয়ে তাকে অভ্যস্ত করে তোলা। কারন সুস্থ ও শক্তিশালী গণতন্ত্রে জনগণের প্রশ্নই নির্বাচিত সরকারকে সঠিক দিশা প্রথপ্রদর্শন করে। নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে জনগণকে তার মৌলিক অধিকার ও ক্ষমতা বিষয়ে অবগত করতে হবে। জনগণ যে শুধুই ভোটদেওয়ার রোবট নয় সবার আগে এই ধারণা দূর করতে হবে। নতুবা কোনো গনতন্ত্রই রক্ষিত হবেনা, আর দীর্ঘকাল জনগণকে উপেক্ষা করতে থাকলে রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্বের পরিচয় রক্ষা করতে পারবে না।

খুব সামান্য পরিসরে ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’ সম্বন্ধে একটা প্রাথমিক ধারণা দিতে প্রচেষ্টা করলাম। এবারে আমরা গণতন্ত্রের অন্য ধরনটা বিষয়ে আলোচনা করব।

দ্বিতীয় পন্থাটা হচ্ছে ‘প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতন্ত্র’, নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এখানে জনগণের তরফে কিছু প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়। এসকল দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন প্রতিটি অঙ্গ রাজ্যের জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি বা ইলেক্টোরাল দ্বারা। এই ইলেক্টোরালদের নির্বাচিত করে সরাসরি সাধারণ জনগণ, অনেকটা আমাদের মত করেই, তবে সবটা নয়। এদের সংসদেরও দুটো কক্ষ থাকে, একটা নির্বাচিত প্রতিনিধি অপরটি মনোনীত। এক্ষেত্রে কোনো একটি রাজ্যের জেলাগুলি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কোনো প্রার্থী ৫১% ইলেক্টোরাল ভোট পেলে- ধরে নেওয়া হয় যে তিনি ১০০% ইলেক্টোরাল জনমত পেয়েছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের গণতন্ত্র বিদ্যমান। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের কাঠামোটির জনগণ নির্দিষ্ট নির্বাচিত আধিকারিককে ভোট দেয়, যারা সরকারের ভিতরে তাদের প্রয়োজনীয়তা উপস্থাপন করেন। প্রতিটি সমস্যার ক্ষেত্রে এই প্রতিনিধিরা তাদের রাজ্যের পক্ষে ভোট দিতে সক্ষম হন। যদিও এই ‘প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে’ জনগণও তাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোট দেয়, কিন্তু সেই ভোটের কোনো গ্রহনযোগ্যোতা নেই তাদের সাংবিধানে। যেমন আমেরিকার জর্জ বুশ কম ‘পাবলিক ভোট’ পেয়েছিল প্রতিদ্বন্দী আল গোরের থেকে; আবার তাদের শেষ নির্বাচনে হিলারি ক্লন্টন জনগণের ভোটে সর্বোচ্চ ভোট পেলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ইলেক্টোরাল ভোটে এগিয়ে থাকায় তিনিই রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে মনোনীত হয়েছিলেন।

প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের কতগুলো ধ্বনাত্বক দিক রয়েছে-
<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>

a) এই ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইন ও সংবিধানের প্রয়োগতম দিক অনেক বেশি সফল। যে কোনো প্রস্তাব, তার খসড়া, ও সিদ্ধান্তের প্রয়োগতম দিক দিয়ে এই ধরনের সংসদ ব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষ হয়ে থাকে।

b) এক্ষেত্রে কোনো ইশ্যুভিত্তিক ভোট হয়না, ইলেক্টোরালরা নির্বাচিত হয় রাজনৈতিক দলের নীতি ও ব্যাক্তির গুণের উপরে।

c) দ্বিদলীয় বা বহুদলীয় ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি দল কখনই ক্ষমতাসীন দলের চেয়ে বেশি শক্তি অর্জন করে সরকার ফেলে দিতে পারেনা।

d) সমানুপাতিক সিদ্ধান্তগ্রহনের ক্ষেত্রে এই জাতীয় গণতন্ত্র বেশি কুশলী।

e) এই গণতন্ত্রে জনগণ যোগ্য কর্মকর্তা বেছে নেয়, যে কর্মকর্তারা রাষ্ট্র যন্ত্রের চালকদের বেছে নেয়।

f) এই ধরনের গণতন্ত্রে যেকোনো সিদ্ধন্তগত সমস্যার সমাধান অতি দ্রুত ও তাৎক্ষণিক ভাবে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব।

g) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে যেকোনো সময়, সমবেত জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে দ্বারা বদলে ফেলার সুযোগ থাকে, এমনকি সেই প্রতিনিধিকে অপসারণের জন্যও ভোট দানের সুযোগ থাকে।

h) জনগণকে প্রতিনিয়ত ভোটদানের মত একটা অস্বস্তি থেকে মুক্ত রাখে।

ঋণাত্বক দিক গুলো হল-
<<<<<<<<<>>>>>>>>>

a) জনগণ যাদের নির্বাচন করে তাদের জবাবদিহি করতে হয়না, আরা জবাবদিহি করতে বাধ্য তাদের সাথে জনগণের প্রতক্ষ্য সংযোগ থাকেনা কারন তারা প্রতিনিধিদের ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে।

b) এই ধরনের গণতন্ত্র জনগণের ভাবনাকে অনেকাংশে প্রতিহত করে, কারন এই ইলেক্টোরালদের সংঘবদ্ধ হবার কোনো স্থান নেই। এক্ষেত্রে একবার ভোটপ্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে সরকার ও জনগণের সাথে আর প্রতক্ষ্য কোনো সম্পর্ক থাকেনা। সরকারের ভালমন্দ নিয়ে নিজেদের মত জাহির একমাত্র জাইগা আগামী নির্বাচন।

c) নির্বাচিত ইলেক্টোরালরাও সকলে সমান গুরুত্ব পায়না। “winner-take-all” আইনের বলে, বিরোধী দলের কোনো ভূমিকাই থাকেনা ইলেক্টোরাল বোর্ডে।

d) গোটা সিস্টেমটা ক্ষমতাসীনদের পক্ষ নিয়ে থাকে, ফলস্বরূপ বিরুদ্ধ মতযুক্ত জনগণের কন্ঠরোধ হয়।

e) রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন সহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহনের বিষয়ে প্রতারণার সুযোগ বহুলাংশে বেড়ে যায়, কারন একটা অঞ্চলের সমস্ত জনগণকে বিভ্রান্ত বা উৎকোচ দিয়ে দলে টানার চেয়ে একজন প্রতিনিধিকে ফুসলিয়ে নিজেদের পক্ষে টানা অনেক সহজ। এক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্ত গ্রহনের সুযোগ অনেক বেড়ে যায়।

f) সংসদের উচ্চকক্ষ, নিন্মকক্ষ, ইলেক্টোরাল কলেজ, ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিরা সমান সময় পায়না। কেউ ২ বছর, কেউ ৪ বছর, কেউবা দশ বছর।

g) বিভিন্ন “লবি” গুলো এখানে খুল্লামখুল্লা তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তদ্বির করতে পারে।

…ক্রমশ

©তন্ময় হক

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *