প্রধানমন্ত্রী যত্ন তহবিল

চতুর্দিকে PM CARES নিয়ে বেশ একটা হইচই রইরই বিষয় চলছে। তবে বিষয়টার উদ্দেশ্য মহৎ, অন্তত রাষ্ট্র তেমনই জানিয়েছে জনগণকে, আর আমরা জানি রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান, অতএব রাষ্ট্র যাহা বলিবে তাহাই সত্য।

মোদ্দাকথা বিষয়টা পাতি বাংলায় হল- প্রধানমন্ত্রীর যত্নসমূহ।
বাখ্যাতে- প্রধানমন্ত্রীর যত্নসমূহ ‘দরকার’ এটাও হতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর যত্নসমূহ ‘পাবেন কেউ কেউ’ এটাও হওয়ার চান্স সমপরিমাণ।

নামকরণে যে বিশেষ মুন্সিয়ানা রয়েছে এটা মানতেই হবে, যার দ্বারা বাক্যগত মূল ভাবার্থটা কিন্তু উহ্য রয়েছে, যা পরস্পরবিরোধী। অথচ একটা ‘Relief’ শব্দ থাকলেই ত্রান বিষয়টা জুড়ে যেত, স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী ত্রানের জন্য আহ্বান করছেন বোঝা যেত। কিন্তু এখানে দ্বন্দ্বমূলক নামকরণের মধ্য দিয়েই বহু সম্ভাবনা খুলে দিয়েছেন।

প্রথমেই জেনে নেওয়া দরকারঃ রাষ্ট্র কি জানিয়েছিল ওয়েবসাইটে-

1. মহামারিকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত এই দাতব্য তহবিল- ক্ষতিগ্রস্থদের নিকটে ত্রাণ সরবরাহই ‘প্রাথমিক’ লক্ষ্য।

2. জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরী পরিস্থিতি, মনুষ্যনির্মিত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা সঙ্কট মোকাবিলা, স্বাস্থ্য পরিসেবা সংক্রান্ত ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির উন্নতি সাধনে, অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রাসঙ্গিক গবেষণা, ও বিবিধ যে কোনও প্রকারের সহায়তায় এই তহবিল অর্থ যোগান দেবে।

3. ট্রাস্টের গঠনতন্ত্র- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে, মাননীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মাননীয় অর্থমন্ত্রী, ও মাননীয় ভারত সরকার ‘ট্রাস্টি তহবিলের’ প্রাক্তন কার্যনির্বাহী প্রধান।

4. ট্রাস্টির চেয়ারমান তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বোর্ডের যেকোনো তিনজন মাননীয় সদস্যকে বেছে নেবেন। যে সদস্যেরা সমাজের সবচেয়ে বিশিষ্ট ব্যাক্তিদেরকে বেছে নেবেন- যারা সিদ্ধান্ত নেবে যে- গবেষণা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, সমাজিককর্ম, আইন, জনপ্রশাসন এবং সমাজসেবা ক্ষেত্রে এই তহবিল থেকে সাহায্য পাবে।

5. ট্রাস্টি যেকোনো ব্যাক্তিকে ‘জনস্বার্থের’ কারনে নিয়োগ করতে পারে।

6. তহবিলটি সম্পূর্ণরূপে- সাধারণ ব্যাক্তি, কোম্পানী বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের দানের অর্থেই পুষ্ট থাকবে, সরকারী বাজেট তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এখানে কোনো অর্থ বরাদ্দ হবেনা।

7. এই তহবিলের যেকোনো দান, আয়কর আইন ১৯৬১ অনুসারে, ৮০-জি ধারার অধীনে ১০০% করছাড়ের সুবিধা যোগ্য। এছাড়া কোনো কোম্পানি যদি এখানে অনুদান দেয় সেটাও- Corporate Social Responsibility (CSR), ২০১৩ আইনের অধীনে গণ্য হবে।

8. PM Care বিদেশী অনুদানও নিতে পারবে, তার জন্য আলাদা একাউন্ট খোলা হয়েছে।

9. ২০১১ সালে Prime Minister’s National Relief Fund (PMNRF)’ বিদেশী অনুদান নিয়েছিল, তাই PM Care ও বিদেশী অনুদান নিতেই পারে, কারন সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে PM Care- (PMNRF) এর সমান ও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

খুবই সরল কিছু নিয়ম। উদাত্ত কন্ঠা দানের আহ্বান জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানসেবক। কিন্তু কিছু প্রশ্ন উঠেই যায়, পূর্বের নাম্বার অনুয়ায়ী যথাক্রমে-

1. প্রাথমিক লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্থদের ত্রান দান, তাহলে মধ্যমপর্যায়ের বা আনুষাঙ্গিক তথা গৌণ বিষয় গুলি কি কি? সেগুলো স্পষ্ট নয় কেন?

2. স্বাস্থ্য পরিসেবা সংক্রান্ত ও “ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির উন্নতি সাধনে” এই টাকা খরচ হবে। স্বাস্থ্যের দিক থেকে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বাজে অবস্থায় দেশের অর্থনীতি। অনিল ভাই দেউলিয়া হয়ে গেছে, লকডাউনে মুকেশ ভাই এর সম্পদ হুড়হুড় করে কমে গেছিল, অনেকটা জিও বেচে সামাল দিয়েছে। আদানি ভাই, মেহুল ভাই, নীরব ভাই, সুভাস চন্দ্র ভাই, মালিয়া ভাই সহ অনেক এমন ভাই আছেন যাদের ‘স্বাস্থ্য’ অত্যন্ত খারাপ।

সরকারের তো কোনো নিজস্ব ফার্মা কোম্পানি নেই, তাহলে কোন ফার্মা কোম্পানি গুলো এই তহবিলের দান পাবে? কি তার যোগ্যতামান? মোহাল সারাভাই ভাই, পঙ্কজ প্যাটেল ভাই দের মত কজনের ভাগ্য খুলবে এই যতন ফান্ডের অর্থে?

মনুষ্য নির্মিত সঙ্কট তো রয়েইছে, প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ট ব্যবসায়ীরা জনগণের টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়েছে, বা পালাবার ফিকির খুঁজছে। ব্যাঙ্কগুলোই যে শুধু চরম সঙ্কটে তা নয়, সেই ব্যবসাদারেদের পরিবারগুলো তো ভারতে রয়ে গেছে- তারা কি এই তহবিলের সেবার আওতাধীন?

প্রধান সেবকের বন্ধু গুলো, যারা ঋণখেলাপি করে বিদেশবিভূঁইতে পরে রয়েছে অনেকদিন হল, তারাও কি ভাগ পাবে এই অর্থের?

বিধায়ক কেনাবেচা করে স্থিতিশীল সরকারকে টলিয়ে দেওয়া মনুষ্য নির্মিত সঙ্কট, সেই সংকটমোচনের একমাত্র উপায় হচ্ছে বিজেপির সরকার গঠন। এই অর্থ কি ঐ বিরোধী বিধায়কদের কিনতে ব্যবহৃত হবে?

বিবিধ কোন ক্ষেত্রে এই তহবিল অর্থ যোগান দেবে? তারই বা যোগ্যতা মান কি?

3. ইকির মিকির চাম চিকির, ট্রাস্টি বোর্ড গঠন শেষ। সবই সেই রসুনের কোয়া, যার উৎস মুখ একটিই।

4. আচ্ছে দিনের গণতন্ত্রে ৩ জন মিলে সিদ্ধান্ত নেবে কে কি পাবে না পাবে, সেই ‘ব্যানানা রিপাবলিকে’র মতই- আমাদের দেশজ সংস্করণ ‘কাউ রিপাবলিক’ চলছে। এখন সামাজিক কর্ম, সমাজসেবার ক্ষেত্র গুলোর কোনো পরিসীমা নির্ধারিত নেই, তাই এগুলোর সঠিক সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা কি! ভক্তদের ইশকুল RSS ও তো নিজেদের সমাজসেবী সংস্থাই বলে, তাহলে তাদের জন্যই কি এই সাহায্যের অবতারণা?

5. যে কোনো কাউকে নিয়োগ করতে পারে ট্রাস্টি, এই ‘যে কেউ’ কাদের মধ্যে থেকে হবে? ‘যে কেউ’ হবার যোগ্যোতামান কি? IT Cell এর ভাইটিও কি এই এ কেউ এর মধ্যে আসতে পারে? তাদেরও তো নিয়মিত বেতন হয়না, সাংসারিক স্বাস্থ্য ভীষণ খারাপ।

6. সরকারী কোষাগার থেকে চার পয়সাও আসবেনা এই তহবিলে, মানে বাকিরা কেউ কিছুই জানতে পাববেনা তথা তাদের জানার এক্তিয়ার থাকবেনা যে এই ঘুঘুর বাসায় আসলে কটা ডিম বাকি রয়েছে ও যতগুলো থাকার কথা সেগুলো কোথায় গেছে।

7. যে সকল বাক্তি বা কোম্পানি জাতীয় সম্পদের তহবিলে কর হিসাবে টাকাটা জমা করত, তাদের এই কর ছারের সুবিধা দিতেই- তারা অনেকেই ‘এই সুবিধা’ নিতে ঘুঘুর বাসায় গিয়ে ডিম দেবে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা- যারা বা যে কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা দান করছেন বা করেছিলেন সরকারী দান তহবিলে, সকলেই সেই টাকার করছারের সুবিধা নিয়ে নিয়েছে। এই দানের টাকার বেশ অনেকটা অংশ তাকে এমনিতেই দিতে হত ট্যাক্স হিসাবে, এখানে দানকারী ‘দানীর’ সার্টিফিকেট পেয়ে গেলেন বা গেছেন রাষ্ট্রের কাছে। কি নিষ্পাপ সিস্টেম। করের টাকা ঘুরিয়ে দান হিসাবে রাষ্ট্রকে কিছু দিলে তিনি শুধু সতীই নন- মহৎ দানবীরও বটে। এ এক আজব খুড়োর কল।

8. বিদেশ থেকে ফান্ডিং নিতে পারবে, ডলারে বা দিনারে কামাই হবে; যেটা অর্নব গোস্বামী গবেষণার বিষয়- ওগুলো ইতালি থেকে আসবে না হনুলুলু থেকে। যদিও ওই ‘ইকির মিকির’ এর ৩ জন ট্রাষ্টি ছাড়া কেউ জানবেনা কোত্থেকে কি এলো আর কত এলো।

9. ‘কেন তোমাকে দেব’, এটা প্রমানের জন্য সেই নেহেরু আমলের লেগাসির সাথে এই তহবিলকে সমান ও সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখানো হয়েছে সম্মানের দিক থেকে। এরা ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিল, নিজেদের উচ্চতা মাপার একমাত্র পরিমাপক যন্ত্র হল নেহেরু বা মনমোহন আমল। নেহেরু বা মনমোহন ছাড়া এদের মূল্য গণনার হিসাবেও আসেনা এতই অপদার্থ নিকৃষ্ট।

এবার আপনি আমাকে বলুন, এমন একটা খুড়োর কলকে কোন গাড়ল CAG এর অডিটের সামনে নিয়ে যাবে? যদি অডিটই করাবার হত, তাহলে তো ট্রাস্টিতে ‘যৌথ সংসদীয় কমিটি’ থাকত। আপনি কি ‘ভক্তদের আধারকে’ও ভক্তদের মত ‘হাঁটুতে বুদ্ধি’ ভাবেন! ঘাপলার উদ্দেশ্য নিয়েই তো এই ঘুঘুর বাসা বানানো হয়েছে।

অবশ্য নামেই তো বলা রয়েছে, এই তহবিল প্রধানমন্ত্রীর যত্নসমুহের জন্য। রিটায়ার্ড পরবর্তী- বেচারির সিকিউরিটি বিদেশভ্রমন সহ বাকি জিনিস গুলো কীভেব হবে শুনি! প্রসূন যোশীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেখেননি বেচারা প্রধানসেবক আসলে একজন ‘ফকির’, যে ফকিরি ধীরে ধীরে ওনার মধ্যে বেড়েই চলেছে। এটা তো সেই ফকিরেরই ঝোলা ভরার আমন্ত্রণ।

মিছিমিছি এই লেখাজোখা করলাম,
ছ্যাঃ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *