অনেকেই শুধায় আপনার ধর্ম কি, জবাব দিতে পারেননা অনেকেই। কেউ সটান বলে দেন- হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ খ্রিষ্টান, কেউ বৌদ্ধ বা কেউ অন্য কিছু; কেউ কেউ সঙ্কোচ করে বলেন- মানবতা। আসলে ধর্মকে আমরা অতিক্ষুদ্র গণ্ডিতে বেঁধে ফেলেছি আমাদের কূপমুণ্ডকতার দরুন, অথচ ধর্মের ব্যাপ্তি বিপুল।

‘এ মায়া প্রপঞ্চময়’

জড় পৃথিবীতে সকলেরই ধর্ম রয়েছে, ধর্মহীন এমন কিছুই নয় এই মহাবিশ্বে। গাছের ধর্ম রয়েছে, পশুর ধর্ম রয়েছে, জীবানুর ধর্ম রয়েছে। আমাদের মস্তিষ্কের ধর্ম ভাবনা বুদ্ধির বিচার বিশ্লেষণ করা, ধর্ম বিচ্যুতি হলেই উন্মাদ হয়ে যাব। আমাদের হৃদয়ের যে স্পন্দন তারও একটা নির্দিষ্ট ধর্ম আছে, ছন্দে ছন্দে স্পন্দিত হয়, বিচ্যুতি হলেই সমূহ বিপদ। শ্বাস-প্রশ্বাসের ধর্মও রয়েছে, শরীরবৃত্তীয় প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গ্য তার ধর্ম পালন করে। ঋতুর ধর্ম আছে, যা পরিবর্তনশীল। জলের ধর্ম প্রবাহিত হওয়া, মাটির ধর্ম ফসল ফলায়, বাতাসের ধর্ম উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া, সুর্যের ধর্ম উত্তাপ দেওয়া, মেঘের ধর্ম বর্ষণ করা, বরফের ধর্ম শীতলতা প্রদান করা- তাহলে কে এমন আছে যার ধর্ম নেই? মৃত্যু বা বিনাস- সেটাও তো ধর্মই।

এই সকলের নিরিখে আমারও ধর্ম দুটো- মৌলিক ধর্ম ও ভৌত ধর্ম।

মৌলিক ধর্ম হিসাবে আমার ইন্দ্রিয়জনিত ধর্ম রয়েছে- চোখের রয়েছে দৃষ্টিধর্ম, যা বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। কানের রয়েছে শ্রবণ ধর্ম, ত্বকের রয়েছে স্পর্শ ও অনুভূতি গ্রহণের ধর্ম, নাকের রয়েছে গন্ধ শোকার ধর্ম, জিহ্বার রয়েছে স্বাদ গ্রহণ ও বাকশক্তি প্রকাশের ধর্ম।

আমার রয়েছে রিপুগত ধর্ম। ‘কাম’ রয়েছে, বয়ঃসন্ধির পর থেকে এই জৈবিক ধর্ম আমি পালন করে চলছি, ধর্মান্ধ হলে যা যৌন নিপীড়ণের কারন হয়। ‘ক্রোধ’ ধর্ম রয়েছে, অন্যায় অবিচারের সাথে এই ধর্মের পালন হয়ে থাকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে, যা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে। ‘লোভ’ ধর্ম আছে বলেই সমাজে রয়েছি, নতুবা ত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে যেতাম। সংসারের ‘মোহ’ ধর্মের বাঁধনেই বন্দী; ‘মদ’ মত্ততা ধর্ম আমার রয়েছে- যার দ্বারা গর্ববোধ বা অহং বোধের জাগরণ হয়। ‘মাৎসর্য’ ধর্মও চরিত্রে ভীষণ ভাবে বিদ্যমান, নতুবা- ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ, অপকার, হনন ইত্যাদি কীভাবে আমাকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। এই প্রতিটি ধর্ম সকলেরই রয়েছে কিন্তু ভূ-বিশ্বের বাকি কারো সাথে ‘আমার’ এই রিপু-ধর্ম মিলবেনা; প্রতিটি প্রানীর এই ধর্ম স্বতন্ত্র তথা মৌলিক এবং সামঞ্জস্যহীন।

ভৌত ধর্ম হিসাবে সময় ও পরিস্থিতি অনুয়ায়ী ব্যবহার ধর্ম নিত্য পরিবর্তিত হয়। যথাক্রমে-

  • সন্তান ধর্ম,
  • সহোদর ধর্ম
  • প্রেমিক ধর্ম
  • স্বামী ধর্ম,
  • পিতা ধর্ম,
  • আত্মীয় ধর্ম,
  • বান্ধব ধর্ম,
  • পড়শী ধর্ম,
  • সামাজিকতা ধর্ম,
  • নাগরিক ধর্ম,
  • পেশাগত ধর্ম,
  • ঐশ্বরিক বিশ্বাস গত ধর্ম
  • জ্ঞানান্বেষণ ধর্ম
  • প্রমোদ ধর্ম
  • ত্যাগ ধর্ম
  • সহমর্মীতা ধর্ম

ধর্মের কি শেষ আছে, শেষ নেই। অথচ আমরা শুধুই মাত্র ঐশ্বরিক বিশ্বাসমূলক ধর্ম নিয়েই মত্ত থাকি। বাকিগুলোর আচার পালনে তেমন আমরা উৎসাহী নয়, যেভাবে পণ্ডিতেরা নিদান দিয়েছেন। ধর্মান্ধদের কাছে অনুরোধ, আপনি উপরোক্ত প্রতিটি ধর্মকেই অন্ধভাবে অনুসরণ করুন- এটা আপনার ঐশ্বরিক ধর্মগ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাহলেই দেখবেন আপনার ওই ‘ঐশ্বরিক ধর্মকে’ রক্ষা করার জন্য উন্মত্ত হিংস্র সাম্প্রদায়িকতাকে আধার করতে হবেনা।

যতক্ষণ বেঁচে আছেই ততক্ষণই আপনার ওই সকল ধর্মাচারণ আপনার ইচ্ছাধীন, মৃত্যু হলেই প্রকৃতি আপনাকে তার নিজের জড় ধর্মে দীক্ষিত করে নেবে, যেখানে আপনার কাছে কোনো বিকল্প থাকবেনা।

আর হ্যাঁ, রাজনীতিও একটা ধর্ম। রাজার ধর্ম রাজধর্ম, জনগণের ধর্ম প্রজাধর্ম। রাজাও যেমন এ কাউকে দন্ড দিতে পারে যদি সেই বাক্তি প্রজাধর্ম পালন না হলে, তেমনই প্রজাকুলও রাজাকে সায়েস্তা করতেই পারে যদি রাজধর্মের উল্লঙ্ঘন করেন। এই ধর্মের পালন ও নিরন্তর গবেষণা প্রতিটি সুস্থ ও সামাজিক মানুষের জন্য আবশ্যক। রাজনীতি এমন একটা ধর্ম, যেখানে উপরোক্ত সকল ধর্ম গুলো দ্রবীভূত হয়ে যায়, এমন সম্মেলন আর কোথাও দ্বিতীয়টি নেই। এমন সম্ভাবনাময় শৈল্পিক ধর্ম যে আর দ্বিতীয়টি নেই ব্রহ্মাণ্ডে।

তাই শুধুই কাউকে আপনার ঈশ্বর বিশ্বাস সম্বন্ধীয় ধর্মের কথা প্রকাশ করবেননা, বরং শুধান- কোন ধর্ম? তারপর উপরের ব্যাখ্যা-

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *