প্রথম পর্ব

অনেকসময় দেখা যায় বস্তির দুটো বাড়িতে আগুন লেগেছে, সকলে ভীষণ কলরবে জলের বালতি নিয়ে সেই আগুন নেভাতে ব্যাস্ত- এই ফাঁকতালে কোনো ‘বিল্ডারের পোষা গুন্ডা’ আরো কিছু ঘরে সেই আগুন ছড়িয়ে দেয়, কারন বস্তির জাইগাটাতে ওই বিল্ডার বহুতল বানাতে চায় মুনাফার লোভে। সিনেমার পর্দাতে আমরা এমন স্ক্রিপ্ট হামেশাই দেখতে অভ্যস্ত।

যে আই হোক, শুরুতেই একটা প্রশ্ন রাখি- প্রতিটি দেশের করোনা-ভাইরাস কি অদৌ একই প্রজাতির?

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৭শে এপ্রিল ২০২০ তারিখে একটা সরকারী প্রেস কনফারেন্সে নিছক মজা করে ‘করোনা ভাইরাস’ সম্বন্ধে বলেছেন- “একে ফ্লু বলতে পারেন, আবার জীবানু বলতে পারেন, আবার ভাইরাসও বলতে পারেন, আমরা সম্ভবত কেউই জানিনা একে কী নামে ডাকা উচিৎ, তাই যেকোনো একটা নামে ডাকলেই হয়”। ট্রাম্প সুকুমার রায় পড়েছেন কিনা জানিনা, যদি পড়িতেন তিনি নিশ্চই জানতেন, কেউ ভীষণ রকমের ভেবলে গেলে ‘হিজবিজবিজ’ নামটা টুক করে তকাই হয়ে যায়, আবার ধমক দিলে নামটা বিস্কুট হয়ে যায় মুহুর্তেই। শুধু তাইই নয়, গুষ্টি শুদ্ধু সকলেই এই একটাই নাম। যেকোনো একটা নামে ডাকলেই হয়। আক্ষরিক অর্থেই সুকুমার রায় এই ‘ননসেন্স রাইম’ রচনা করেছিলেন, আজকের ননসেন্স গুলো ওনাকেই প্রতিষ্ঠা করছে মাত্র। তো সে যাই হোক, বিষয়ে আসি-

SARS-CoV2/Covid-19 পরিচয়ের যে ভাইরাস বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস চালাচ্ছে সে কি একটাই প্রজাতি নাকি অনেকগুলো আলাদা আলাদা প্রজাতির। কারন আলাদা বর্গের, আলাদা গণ ও আলাদা গোত্রের এই SARS বা MARS জীবানু ইতিমধ্যেই রয়েছে! হতেই পারে এটা অলীক ও অমূলক, কিন্তু সন্দেহটা আমার প্রথম শুরু হয় ওই কিটের গণ্ডগোল শুরু হওয়ার পর থেকে। এ যেন সেই- ‘হেড আপিসের জাঁদরেল রাশভারী বড়বাবুটি, ঘরে বৌ’এর সামনে পোষ্য মেনি’। চীনে এ কিট রোগ ধরে দিচ্ছে, স্পেনে তা অকেজো, দক্ষিণ কোরিয়ান কোম্পানির কিটে ভারতে আরামসে রোগ নির্নয় হচ্ছে অথচ লাতিন আমেরিকার দেশ চিলি তা ফিরত পাঠিয়ে দিয়েছে, আয়ারল্যান্ড আমেরিকার তৈরি কিট নিয়ে অভিযোগ করেছে। এমনটা কিন্তু হরদম চলছেই।

ঠিক কীভাবে সংক্রমণ শানাচ্ছে মারাত্মক ভাইরাসটি? কতজন মানুষ আসলে সংক্রামিত হয়েছে? সামাজিক নিষেধাজ্ঞাগুলি কতদিন চলবে? এ সব উত্তরহীন প্রশ্নগুলো সকলের, আমি সেগুলোতে যাচ্ছিনা

প্রশ্ন এক

কেউ বেশি অসুস্থ কেউ কম অসুস্থ, কোথাও যুবক মারা আচ্ছে, কোথাও বৃদ্ধ বেঁচে ফিরে আসছেন। কেন?

প্রশ্ন দুই

সাধারণ জ্বর হলে তা প্যারাসিটামলের একটা নির্দিষ্ট মাত্রা শরীরে গেলেই সেরে যায়, তা সেটা আফ্রিকা হোক বা ইউরোপ, এশিয়া হোক বা লাতিন আমেরিকা- চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়মে আসলে সেটাই হয় বা হওয়া উচিৎ। সামান্য কিছু ব্যাতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া আমরা প্রেগনেন্সি কিট বিষয়েও এই একই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যা প্রায় সর্বত্রই একই রেজাল্ট দেয়। কিন্তু করোনার কিট এই মাত্রার সার্বজনীন ফলাফল দিতে অক্ষম।

প্রশ্ন তিন

করোনা ভাইরাস নিয়ে WHO এর গাইডলাইন আমাদের মনে করিয়ে দের সেই নোটবন্দির সময়কার বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির কথা, প্রায় প্রতিদিনিই নতুন নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করত। সেটা নাহয় ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা বিহীন আনাড়ী রাষ্ট্রনেতার নির্বুদ্ধিতা, কিন্তু WHO তো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্থা- গোটা বিশ্বের তাবড় চিকিৎসক, গবেষক ও জ্ঞানীগুণী মানুষদের সম্মেলনে গঠিত একটা সংস্থা, তারাও নির্দিষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি এই মে মাসের শুরুর দিনেও।

কখনও বলছে এটা বায়ুবাহিত জীবানু নয়, কখনও বলছে বায়ুবাহিত। কখনও বলছে অসুস্থ ছাড়া মাস্কের প্রয়োজন নেই, কখনও বলছে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের জন্য মাস্ক বাধ্যতামূলক। কখনও বলছে এটা সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে বৃদ্ধ ও শিশুদের, আবার বলছে এটা মহিলাদের জন্য প্রাণঘাতী। সামাজিক দুরত্ব মানে ঠিক কতফুট হলে একজন সুস্থ মানুষ নিরাপদ, এ বিষয়ে তারা আজও পর্যন্ত ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। কোয়ার‍্যান্টিন পিরিয়ড কতদিনের তাও অজানা!

কখনও জানাচ্ছে ফুসফুস এবং শ্বাসনালীতে সংক্রমণ হয়, কখনও হৃৎপিণ্ড, রক্তনালী, কিডনি, বিভিন্ন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি এবং স্নায়ুতন্ত্রগুলিতে আক্রমণ শানাচ্ছে বলে জানাচ্ছে, কিন্তু বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কি প্রতিক্রিয়া করছে তা অজানাই রয়ে গেছে। পাতিবাংলায় তারা নিজেরাই ঘ্যেটে ঘ হয়ে রয়েছেন। কেউ জানেনা এটা জলবাহিত কিনা, প্রানীজ বর্জ্য বাহিত কিনা! কোন পৃষ্ঠতলে আসলেই কতক্ষণ বাঁচে ইত্যাদি। গোটাটাই একটা অনন্ত গোলকধাঁধার মত।

প্রশ্ন চার

যারা মারা গেলেন তারা তো মরে বাঁচলেন, কিন্তু যারা সেরে উঠছেন তারা ঠিক ‘কি কারনে’ সেরে উঠছে এবিষয়ে কোনো গবেষণাপত্র বৈশ্বিক মান্যতা পায়নি। সেরে ওঠা ওই ১০ লক্ষ নির্দিষ্ট রোগীর মাঝে কোন উপাদানটা ‘Common element’ যার কারনে ওনারা এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, এ নিয়েও গোটা বিশ্ববাসী অন্ধকারে।

প্রশ্ন পাঁচ

কিছু রোগীর বাহ্যিক উপসর্গ দেখে সনাক্ত করা গেলেও কিছু রোগী সম্পূর্ণরূপে উপসর্গহীন। এরই বা কারন কি? কেনই বা একজন সেরে উঠা রোগী আবার ওই একই জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন? কীভাবে এই রোগ বিস্তার করছে সেটাই সঠিকভাবে জানা যায়নি। কমিউনিটি স্প্রেডিং এর মাধ্যমেই যদি এ জীবানু বিস্তার লাভ করে, তাহলে আমাদের দেশ তো এতদিনে শ্মশান হয়ে যেত, কারন নামে লকডাউন হলেও আসলে কি হচ্ছে তা আমাদের নিজেদের চেয়ে কেউ বেশি ওয়াকিবহাল নয়। বারো ঘর এক উঠোনের কমন টয়লেট সহ ঘিঞ্জি বস্তিগুলো সেক্ষেত্রে জনশূণ্য হয়ে যেত- সেখানে কোনো লকডাউনই হয়নি। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তা মোটেই হয়নি।

প্রশ্ন ছয়

মৃত্যুর হারে এত তারতম্য কেন? আমেরিকার ১১ লাখ আক্রান্তে যেখানে মৃত্যু হয়েছে ৬২ হাজারের একটু বেশি, মানে সাড়ে পাঁচ শতাংশের একটু বেশি। আবার মোট ইউরোপ মহাদেশের আক্রান্ত ১৪ লাখের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার, শতাংশের হারে আমেরিকার প্রায় দ্বিগুন। আফ্রিকাতে এই হার ৪ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় সাড়ে চার শতাংশ।

দেশ হিসাবে যদি ধরা হয়, ইংল্যান্ডে আক্রান্তদের মধ্যে মৃতু হার সর্বোচ্চ- ১৬%; কিন্তু জার্মানিতে সেটাই ৪ শতাংশের একটু কম।

‘সেরে উঠা ও মৃত্যুর’ আনুপাতিক হারের নিরিখে ইংল্যান্ডে মৃত্যুহার সর্বোচ্চ, যা ভয়াবহ- 7:93 Ratio। কিন্তু গোটা ইউরোপের নিরিখে এই হিসাব 88:22 । আমেরিকাতে এই হার 70:30 ratio, আমাদের ভারতে এটা 89:11 ratio তে রয়েছে।

প্রসঙ্গত এখানের সমস্ত তথ্যই চীনকে উহ্য রেখে, কারন তাদের প্রকৃত তথ্য সম্বন্ধে কেউই জ্ঞাত নয়।

সুতরাং স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সব দেশের ভাইরাস আসলে একটাই নয়। আমি আগেও ‘গবেষণা কোরনা’ প্রবন্ধে লিখেছিলাম যে- সকলে ভ্যাকসিন আবিষ্কারে উদ্যোগী, কারন তা লাভজনক। কিন্তু অধিকাংশ গবেষকই- দেশ ভিত্তিক ভাইরাসের জাত বিচার, তার Genetic গঠন বিশ্লেষণ, তার বংশবিস্তার, সংক্রমণের পদ্ধতি ইত্যাদি অর্থনৈতিক ভাবে অলাভজনক বিষয়ে গবেষনাতে খুব একটা উৎসাহী নয়, উপরোক্ত প্রবন্ধে এর কারন সবিশেষে বিশ্লেষণ করা রয়েছে।

প্রশ্ন উঠা কি তাহলে স্বাভাবিক নয় যে, সত্যিই এই ‘Coronavirus Pandemic’ আসলে এক প্রজাতিরিই ভাইরাস নাকি অনেকগুলো জাত?

আগামী নিশ্চই এর জবাব দেবে, কিন্তু ততদিনে ভাইরাস আর তাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত অর্থনৈতিক দুর্ভোগের শিকার হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

…ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *