বাঞ্চারামের বাদাম

উপসংহারে বলাই যেতে পারে, নিঃসন্তান স্টিফানো মাঞ্চিনি, অভিজাত বর্ধিষ্ণু পরিবারের একমাত্র সন্তান। উত্তর ইতালির ব্রেসিয়া প্রদেশের ফ্রেঞ্চিয়াকোর্টারের একটা ছোট্ট গ্রামে তার জন্ম, মন্তে অর্ফানোর ঢেউখেলানো বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তার আঙুরের চাষ। ঈশ্বর তার প্রতি অর্থনৈতিক ভাবে ভীষণ সদয় হলেও দুঃখের ঘটনাও তার জীবনে কম কিছু ছিলনা। জন্মের আগেই তার স্নেহময়ী মায়ের মৃত্যু হয়েছিল, এমনিকি পিতার পরিচয় বিষয়েও কারো কাছে কোনো তথ্য ছিলনা। ছোটবেলায় ইস্কুলে যাবার সৌভাগ্য হয়নি তার, অতি শৈশবেই তার যখন বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল স্টিফানোর তখনও কথা ফোটেনি মুখে।

সুন্দরী স্ত্রী মনসান্টোর নিগুঢ় অভিভাবকত্বে বালক বয়স পার করার পূর্বেই একজন দক্ষ চোর হিসাবে স্থানীয় অঞ্চলে ভীষণ সুখ্যাতি অর্জন করে ফেলল। চোরের সাক্ষী হিসাবে একজন গাঁটকাটার প্রয়োজন হয় এ কথা অভিধানে লেখা রয়েছে, সেইমত স্টিফানোও তেমনই একজন স্যাঙাৎ তৈরি করে ফেল্লো কিশোর বয়সে পৌঁছাবার পূর্বেই। আপন মায়ের পেটের ছোটভাই পিয়েরোর সাথে মিলে মান্টুয়া, তুরিন, ভেরোনা, ভার্সেই ইত্যাদি সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের শিল্পকর্মের নিপুণতার ছাপ রাখতে সক্ষম হল। রাষ্ট্রীয় ১০০ দিনের কাজে সে মাঝেমাঝেই কলোসিয়ামে তান্ত্রিকের ভূমিকাতে অভিনয় করত।

এমন বাহাদুর কাজকর্ম দেখে প্রবীনা মনসান্টো অত্যন্ত খুশি হয়ে সদ্য যুবক স্বামী ও ভাইকে মিলানের পলিটেকনিক কলেজে ডাক্তারি শিক্ষার জন্য প্রেরণ করে দিল। মিলানের প্রখ্যাত আইন বিশারদ আন্দ্রে পির্লোর তত্ত্ববধানে চার বছরের মধ্যেই অসি চালনা, ধনুর্বিদ্যা, ঘোড়ায় চড়া ইত্যাদিতে পারদর্শী হয়ে ফ্রেঞ্চিয়াকোর্টারে যখন ফিরে এলো, ‘সিনিওরে’ উপাধিপ্রাপ্ত স্টিফানো তখন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাদার। এসেই মন্তে অর্ফানোর পৈতৃক জমিতে কৃষিকাজে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে স্টিফানো ঠিক করল সে আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনের জন্য অকৃতদারই রয়ে যাবে। চাষের আঙুরের তৈরি শ্যাম্পেন খেয়ে সে বাকি সকল খিদে ভুলে থাকতে পারত, তাই সে কখনই পিজ্জা, পাস্তা, ক্রোসেন্ত বা তিরামিসু চেখে দেখেনি।

ইতিমধ্যে ইতালি দেশে এক রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হলে সমবেত জনতা, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শোনপাঁপড়ি ওয়ালা স্টিফানোকেই তাদের রাষ্ট্রনেতা হিসাবে নির্বাচিত করল রাজকীয় মর্যাদাতে। সেই সিদ্ধান্ত মত সে রোমে পৌঁছাতেই দেশটির জনপ্রিয় খেলোয়ারদের দ্বারা গঠিত কমিটির সাথে আলোচনা করে- “তুত্তা ইতালিয়া গ্রান্দে কুপেরাতিভি লাদ্রো” বা নিখিল ইতালি তস্কর সমবায় সমিতি নামের একটা দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলে ফেললো। এই সমিতিতে নিপীড়িত, অশিক্ষিত, পিছিয়ে পরা চোরেদের উন্নতিকল্পে- চৌর্যপুর্ণা যোজোনা, সিঁধেল বাতায়ন, তস্কর নিরাপত্তা, বাটপারেদের বন্ধু ইত্যাদি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ শুরু হল। এই কমিটির প্রধান হিসাবে নিযুক্ত হল স্টিফানোর বড় ছেলে ব্যারেনো মাজ্জিও মাঞ্চিনি।

নিয়ম মেনে স্টিফানোর মাঝেও বৈরাগ্যের চিহ্ন ফুটে উঠলে, পরিচারিকা মিরান্ডাকে সেবাদাসী বানিয়ে সন্ন্যাস নিয়ে ‘স্কোলাতিনো’ নামের একটা সার্কাসের দল বানিয়ে ফেল্লো। মিরান্ডা তাবু ফেলতো, আর স্টিফানো গুটাতো, কারন স্টিফানোর শরীরের গুপ্তস্থানে একটা জবর সাইজের কুলআঁটি হয়েছিল, সেটাকে নিত্য মালিশের জন্য মিরান্ডাকে সাথে রাখা। এমন করে ইতালির হরেক শহর- ভেনিস, ফ্লোরেন্স, নেপলস সহ পড়শি দেশের মোনাকো, জেনিভা, মার্সেল্লি, লিয়ও, বার্ণ শহরে ঘুরে ঘুরে ব্রতকথা শোনাতে লাগল। এভাবেই সে স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া হয়ে তুরস্কের মাটিতে পৌঁছে পাট চাষ শুরু করে দিল। সেই পাটের কাঠিগুলো যথাস্থানে গুঁজতে গুঁজতে আরো পূর্বের রাজ্য ইরাকের এক কলে জল খেতে গিয়ে সে আবিষ্কার করল- ইরাকের অধিবাসীরা আসলে জলের নামে যেটা খায় সেটা ডিজেল।

ডিজেল আবিষ্কারের আমোদে ইরাকিয়ানরা সোল্লাসে স্টিফানোকে তাদের খলিফা বানাতে চাইলে, স্টিফানো বলল- সে আসলে একজন অধ্যাপক, খলিফার চাকরিতে তার পোষাবেনা। বরং তারা যেন ওকে জাপানে রেখে আসে, কারন একজন সুমো কুস্তিগীর হয়ে স্টিফানোর বিশ্বভ্রমনের শখ। সেই কথামত ইরাকীরা মারতে মারতে স্টিফানোকে আফগানিস্থানে রেখে আসল, সেই মারের চোটে কুল আর আঁটি আলাদা হয়ে যেতেই  মিরান্ডাকে এক সেখ- তার হারেমে সাজিয়ে রেখে দিল।

আফগানিস্থানের ঊষর মরু দেখে স্টিফানোর আনন্দের সীমা রইলনা, সেখানে মনের সুখে সে হিঙের চাষ করতে লাগল আফিম খেতে খেতে। কিন্তু কিছু পাকিস্থানি মোল্লা স্টিফানোর এই সমাজসেবার বিষয়টাকে সহ্য করতে পারলনা, তারা স্টিফানোকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে একমাসের চেষ্টায় গোটা মানুষটাকে ভারতে অনুপ্রবেশ করিয়ে দিল। সব ধরনের অঙ্গপ্রতঙ্গ এক কাছে না থাকার অসুবিধাতে ঠিকঠাক নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া হয়নি মাসখানিক, তাই খানিক প্রাণভরে দম নিয়ে এক দৌড়ে অমৃতসর এসে পৌছালো স্টিফানো। সেখানে শ্যাম্পেন বা আফিম কোনোটাই না পেয়ে পেট ভরে কুলচা আর কড়াই গোস্ত খেয়ে নিল; তারপর একটা লম্বা ঢেঁকুর তুলে, এক গ্লাস মালাই লস্যি সাবড়ে দিল।

তারপর সে কীভাবে যেন উত্তরপ্রদেশ পৌঁছে গিয়েছিল, আর তারপরেই স্টিফানোর গল্প শেষ হল। কারন সঙ্গীতজ্ঞ স্টিফানোর পরিচয় দ্রুতই গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে পরেছিল, এরপরেই কেউ একজন ‘স্টিফানো’ নাম বদলে দিয়ে বাঞ্ছারাম মুৎসুদ্দি করে তাকে জোর করে ‘বাঘ এক্সেপ্রেসে’ তুলে দিল।

ও হ্যাঁ, গোটা ইতিহাসটা আমি তার থেকে নিজে কানে শুনেছি।

বৃদ্ধ বাঞ্ছারাম এখন বাবুঘাটের লঞ্চে বাদাম ঝাল ফেরি করে। বিশ্বাস নাহলে গিয়ে শুধিয়ে আসবেন। জানিনা এখন গেলেই দেখা পাবেন কিনা, লকডাউনে সে বাড়ি চলে যেতেও পারে, আবার ভাইরাস নিয়ে গবেষণাও করতে পারে।

-সূচনা

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

#অকপট ইভেন্ট এর জন্য মুখবন্ধ

করোনার প্রভাবে আমরা গৃহবন্দী বেশ কিছুদিন হল। সময় আর কাটে কই, বহু কিছুই তো করলেন, এবারে খানিক ‘উল্টোপাল্টা’ করুন নাহয়।

অকপট নিয়ে এসেছে একটা মজার ইভেন্ট- ‘মাথামুন্ডুহীন গল্পের আসর’

ধরুন লিখলেন-

“জন্মান্ধ সাধনবাবু সেদিন ছাদে গিয়ে দেখলেন বেশ কিছু রঙিন বাঁদর আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। আনন্দের আতিসায্যে তিনি তখন হাঁক মারলেন নিচের পড়শীদের উদ্দেশ্যে। সেই হাঁক শুনে দাঁড়ি কামাতে কামাতে দৌড়ে এলেন সাধনবাবুর মেজোমাসি। এই মেজোমাসির তিনটে গরু ছিল, যারা আরবি ভাষায় ভীষণ পারদর্শী ছিল ও যাবনাতে হুইস্কি খেতো। তিনি সেই গরুদেরকে ডেকে ছাদে নিয়ে এলেন বাঁদর দেখাতে, অনেকক্ষণ নিরীক্ষণ করে একটা গরু হালুম করে বলল- “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু বাঁদর তো জলে থাকে, ওরা আকাশে কেন”! এমন সঙ্গত প্রশ্ন শুনে সাধনবাবু ভেবলে গিয়ে, একটা গুলতি তাক করলেন একটা নীলপানা বাঁদরের শুড় লক্ষ্য করে।

ওদিকে সাধনবাবুর বাড়ির পাশেই একটা বড় ছাতিমগাছ ছিল, সেখানেই তৃতীয়তলায় সরপরিবারে লাহীড়িবাবুর বাস। ইদানিং ওই ছাতিম গাছে দারুণ সব কলা ফলেছে, এখানে আগে পেন্সিল ফলত। হোসেন সাহেবের পোষা শেয়ালটা সেই কলার লোভে রোজ ছাতিমগাছে চড়ে আজকাল। সাধনবাবুর হইচই শুনে-লাহীড়িবাবু, হোসেনসাহেব, পোষা শেয়াল সবাই মিলে মন্ডলপাড়ার বিয়ে বাড়িতে গেল রঙিন বাঁদর দেখতে”।

কি বুঝলেন?

তাহলে, আপনিও কয়েকটা মাথামুন্ডুহীন গল্প লিখেই ফেলুন, ছোট হোক বা বড়, নিদেন মেজ হলেও কোনো সমস্যা নেই। শুরুর ঝালেমা নেই, চরিত্রের দাবির বালাই নেই, গণনা নেই, সমালোচনা নেই, গভীরতা থাকলেও হয় না থাকলেও; এমনকি ক্লাইম্যাক্সের ঝকমারিও নেই। থাকবে শুধুই নির্মল আনন্দ, তাহলে ঝটাপট লিখেফেলুন আর অকপটে সাঁটিয়ে দিন-

#মাথামুন্ডুহীন_অকপটে হাসট্যাগ সহ।

হ্যাঁ, তবে সেটা গল্প হতে হবে, টু-লাইনার বা আড়াই লাইনের অনুগল্প নয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *