গণতন্ত্রঃ মিথ ও পৃথীবি-৪

চতুর্থ পর্ব

তৃতীয় পর্বের ফেসবুক লিঙ্কঃ https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10207130579618682&id=1707681415

উপরোক্ত দুই ধরনের গণতন্ত্রেই মূলত দুটো অধিবিভাগ দেখা যায়, যথা- সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রপতি পরিচালিত গণতন্ত্র।

সংসদীয় ব্যবস্থাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা সংসদেরা মিলে তাদের নেতা নির্বাচন করে। এই নির্বাচিত নেতাই সরকারের সর্বাসের্বা তথা প্রধানমন্ত্রীর হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন, মন্ত্রীসভার বাকিদেরকে মূলত তিনিই মনোনীত করেন। এই ধরনের গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রধান ‘রাষ্ট্রপতি’ হলেও তা নেহাতই একটা আলঙ্কারিক পদ বহুলাংশে, তবুও রাষ্ট্রের সকল কিছু রাষ্ট্রপতির নামেই সম্পাদিত হয় প্রোটোকল অনুয়ায়ী। এই ব্যবস্থায় যেকোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদেরা তাদের নেতা তথা তথা প্রধানমন্ত্রীকে যেকোনো সময় বদলে ফেলতে পারে। এই গণতন্ত্রের অনুশীলনে দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ট সংসদীয় দলটি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, যাদের কাজ হয়- গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি আনুগত্য রেখে, সরকারের গঠনমূলক বিরোধিতা বা সমালোচনা। মন্ত্রীগোষ্ঠীর সাথে- সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ মিলে গঠিত বিভিন্ন সংসদীয় যৌথ কমিটি গঠনের মাধম্যে সরকার পরিচালিত হয়ে থাকে।

রাষ্ট্রপতি পরিচালিত গণতন্ত্রে, রাষ্ট্রপতি একাই- রাষ্ট্র ও সরকার উভয়ের প্রধান পরিচালক হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হিসাবেই সরাসরি মানুষের ভোটে জিতে আসে, সমগ্র মন্ত্রীসভা রাষ্ট্রপতির আয়ত্তাধীন থাকে। এক্ষেত্রে আইনসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ বা অভিযুক্ত করার ক্ষমতা রাখলেও বহিষ্কার করার ক্ষমতা রাখেনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, কারন রাষ্ট্রপতি ও আইনসভা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ বিশিষ্ট, এক বা একাধিক, নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তিদের ঐক্যমত্যে আনা অতীব দুঢ়হ কর্ম।

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই কখনও না কখনও ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশ ছিল, যে ইউরোপ গণতন্ত্রের ধাত্রী ভূমি। অথচ তারাই গোটা বিশ্বকে দাস বানিয়ে রেখেছিল বেশ কয়েক শতাব্দী, গণতন্ত্রের আজকের ধ্বজাধারীরাই সমগ্রবিশ্বের অধিকাংশ দেশগুলোকে পরাধীনস্ত করে রেখেছিল সম্পদ লুঠের জন্য। বহু রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর, উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেশগুলো সার্বভৌমত্ব তথা স্বাধীনতা লাভ করে। তাই লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সর্বত্রই অষ্টাদশ শতকের ইউরোপিয়ান আইনের উপরে ভিত্তিকরে স্বাধীন দেশগুলির সংবিধান রচিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা সময়ের চাহিদায় নিজ নিজ দেশের মত করে সংযোজন, সংশোধন, ও পরিমার্জন করে ‘প্রতিটি’ স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পৃথিবীতে বেশ কিছু দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব তথা ক্ষমতা বন্টনের মাধ্যমে এক ধরনের শঙ্কর জাতীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, কিছু দেশে আবার প্রত্যক্ষ ও প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মিশেলে একটা মিশ্র গণতন্ত্র বিন্যাসিত হয়েছে।

একটা সময় গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রে মাঝে বেশ কতকগুলি বিরোধ ছিল; কোনটা বেশি জনহিতকর নাকি দুটোই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত- এ নিয়েও তর্কের শেষ নেই আজও। কারন ব্রিটেন, স্পেনের মত বেশ কিছু দেশে এখনও প্রতীকি রাজক্ষমতার আধারে ‘সাংবিধানিক রাজতন্ত্র’ বর্তমান, সেখানে প্রজাতন্ত্র শব্দটা ব্যবহার করা যায়না। আবার ভারতের মত দেশে না রাষ্ট্রপতি না প্রধানমন্ত্রী না কোনো রাজতন্ত্র সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক, আমাদের দেশের সিস্টেমটা আক্ষরিক অর্থে ‘প্রজাতন্ত্র’, যেখানে জনগণই রাষ্ট্র ও সরকারের নিয়ন্ত্রক। মেয়াদ ফুরালে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী যে ই হোক তাকে ক্ষমতায় থাকতে গেলে মানুষের ভোটে জিতে আসতেই হবে।

প্রজাতন্ত্র হলেই যে সোনার কাঠি হবে তেমনটাও হয়; আমাদের দেশে কি প্রতিটি জনগণ তার প্রাপ্য সুবিধা ভোগ করে? আমাদের দেশে কি রাজনৈতিক অনুশীলন সম্পূর্ণ ‘কপি-বুক’ গণতান্ত্রিক নিয়ম মানা হয়? ‘ভারতীয় গণতন্ত্র ও তার প্রয়োগ’ নিজেই একটা বিপুল চ্যাপ্টার, তার পরবর্তী কোনো ফুরসতে এ বিষয়ে আলাপ করা যাবে। কোনো কোনো দেশে ধর্মীয় আনুশাসনিক গণতন্ত্র বর্তমান, যেমন পাকিস্থান বা আগের নেপাল ইত্যাদি। এগুলো সবই ওই শঙ্কর প্রজাতীয় গণতন্ত্র, যারা কোনো আদর্শলিপি পাওয়া যায়না। মার্ক্সীয় তত্ত্বকে ভিত্তি করে বহুদেশে সমাজতন্ত্রিক গণতন্ত্র প্রচলিত রয়েছে, এখানে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনা করে যারা সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে প্রতিনিধিত্ব করে, এখানে গণভোটের কোনো বালাই নেই। বহুলাংশেই দেখা গেছে সামাজিক গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই ‘সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থায়, কারন ক্ষমতার বৈভব ও ক্রমবর্ধমান লালসা- বহুলাংশেই মার্ক্সীয় নীতি থেকে সরে গিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আইন লাগু হয়েছে।

কিছু দেশে নির্বাচন বিনাই ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে জুড়ি কমিটি জনগণের মধ্যে থেকে যাকে বেশি যোগ্য মনে করবে তাকেই রাতারাতি ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে- একে ‘সর্টিসন’ গণতন্ত্র বলা হয়। কিছু দেশে সংখাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠীগুলো ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে একটা গণতান্ত্রিক সমন্বয় গঠন করত, যাকে ‘একচেটিয়া’ গণতন্ত্র বলা হয়। এখানে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো থাকে। এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রদেশে- Inclusive democracy, Participatory politics Democracy, Cosmopolitan Democracy, Creative democracy, Guided democracy ইত্যাদি নামের ভিন্নভিন্ন উপধারার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায় ইতিহাসে। এর বাইরেও যৌক্তিকতন্ত্র, সমষ্টিতন্ত্র, বিচক্ষণতন্ত্র, মৌলিকতন্ত্র নামের কয়েকটি গণতান্ত্রিক মতবাদের উদ্ভব হয়েছিল, যা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশ শতকের গোঁড়ার দিকে ইউরোপের ‘চূড়ান্ত ব্যাক্তি স্বাধীনতাকামী’ একটা শ্রেনীর জনগণের কাছে গণতান্ত্র বা রাজতন্ত্র ও তাদের সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত সরকার ব্যবস্থারই প্রয়োজন নেই বলে বিশ্বাস করত। রাজতন্ত্রকে যেমন ‘মনার্কি’ বলা হয় ইংরাজিতে, তেমনই সরকারের প্রয়োজনীয়তাকেই মান্যতা না দেওয়াটাকে ‘এনার্কি’ বলা হয়। শুদ্ধবাংলাতে একে ‘নৈরাজ্যবাদ’ বলা হয়, অনেকে ক্ষেত্রেই এদের দ্বারা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হত বলে- একে মাৎস্যন্যায়ও বলা হয়। যারা এনার্কিতে বিশ্বাস রাখে তাদের এনার্কিষ্ট ও তাদের মতবাদকে এনার্কিজম নামে ডাকা হয়। এনার্কিজম কোনো প্রকারের কর্তৃত্তকারীকেই স্বীকৃতি দেয়না, এই মতবাদে শাসক মানেই প্রহসন। তারা বিশ্বাস করে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেখানে কর্তৃপক্ষ ছাড়াই সমাজ থাকবে, প্রতিটি ব্যাক্তি নিজেই স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান- এবং এভাবেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব।

কিছু বেসরকারি ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক ভোটদান প্রক্রিয়ায় তাদের কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়ে থাকে, যেমন কো-অপারেটিভ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রমুখ।

এই হল গণতন্ত্র বিষয়ে, মোটের উপরে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা।

…ক্রমশ

তথ্যঋণঃ উইকিপিডিয়া

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *