কাঁদো মানুষ কাঁদো….

আজ ১৫ জন ঘুমন্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর দিয়ে মালগাড়ী চলে গেল মহারাষ্ট্রের ঔরাঙ্গাবাদে, আসলে ওটা ছিল একটা পচা গলা রাষ্ট্রব্যবস্থার শব। আজ যারা চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় অবহেলার দরুন শহীদ হয়েছেন, তারা তো আর আমাদের মা নয়, আমাদের ভাই নয়, আমাদের সন্তান নয়! অতএব আমার-তোমার নিশ্চুপ থাকাটাই স্বাভাবিক, আমাদের গর্জন, প্রতিবাদ, সহমর্মিতা, প্রতিরোধ সবই ইজেরে বন্দী রয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। রাজরোষের ভয়ে কিম্বা রাজমধুর উচ্ছিষ্ট- জিভকে আঠার মত আঁটকে রেখেছে স্বস্থানে। নতুবা প্রতিদিনিই পরিযায়ী শ্রমিকদের উপরে- রাষ্ট্র সংগঠিত হত্যাকান্ডের পরেও আমরা কী নিদারুণ ভাবে নিশ্চুপ, সুশীল সেজে ওম নিচ্ছি।

উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে আছি আমরা, জানি কালকের লক্ষ্য আমি- তার পরেও। আমাদের মজ্জার ঘুণ মগজে পৌঁছেছে, হিতাহিতের জ্ঞান নেই। প্রধান আমাত্যর তরফে শুধুই ভাষণবাজী, কোনও নীতিই নেই- তাই প্রয়োগেরও বিড়ম্বনা নেই। ও হ্যাঁ, আমাদের স্বরাষ্ট্র দপ্তরেরও একটা মুখ্য আমাত্যও ছিল, তাঁর যাবতীয় কুশলতা হোক বা উচ্ছ্বাস- সবটাই তিনি তুলে রেখেছেন আগামীর জন্য; যখন ‘না-নাগরিকতা’ আইনের বলে আবার কিছু দীনহীনকে বাস্তুচ্যুত করা হবে তার প্রতীক্ষায়। তাই, আজ এই গরীব গুর্বো পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথ্যা নেই। ওনারা সম্রাট, থালা বাজাতে বলেন, মোমবাতি জ্বালানোর নিদান দেন, ফুল ছড়ানোর নামে কোটি কোটি টাকা ধুলোয় লুটিয়ে দিতে পারেন, আমাত্যদের বান্ধব পরিসরের আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুঠেকৃত অর্থের ক্ষতিপূরণ দিতে দেন সরকারী কষাগার থেকে, শুধু বরাদ্দ নেই তাদের- যারা দেশের চাকা টেনে নিয়ে যাচ্ছে রক্তজল করা ঘাম দিয়ে।

সকলের জন্য সকল বরাদ্দ আছে, শুধু পরিযায়ী ওই হাভাতে গুলোর জন্য কোনো বরাদ্দ নেই, তাইতো তারা হেঁটে পাড়ি দেবে শত শত মাইল, কতক না খেতে পেয়ে মরবে, কতক পথের ক্লান্তিতে, কতক যানবাহনের ধাক্কা খেয়ে অক্কা পাবে। মরাটাই ওদের নিয়তি- কারন ওরা অযোগ্য মুর্খকে রাজক্ষমতা দান করেছিল। চাণক্যর অমোঘ বাণী- “মূর্খকে রাজ ক্ষমতা দান করলে প্রজার অকাল মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী”। গত দেড় মাস যাবৎ অপরিকল্পিত লকডাউনের মাধ্যমে গরিব মানুষকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। ২০ টাকার পেট্রোপন্য ৭০টাকায় খরিদ করছে, কোথায় সেই বিপুল অর্থ?

যাদের শ্রমের চাকায় ভর দিয়ে গোটা দেশের রথ ছুটছে, সেই দধীচিদের জন্য রাষ্ট্র নিজের চোখের জন্য বরাদ্দ করেছে ঠুলি। নির্লজ্জ পাষান এ মহাভূমের লক্ষ লক্ষ দিনমজুর হেঁটেই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছে; কারন বিভূঁইতে খাবার নেই, আশ্রয় নেই, রোজগারও নেই। নিশীথের অমানিশা, ঝঞ্ঝা, অচেনা অজানা নগর প্রান্তর, যানবাহন হীন আদিম যুগের মত পরিস্থিতি; তাই তাদের পা ই একমাত্র ভরষা। সন্তানকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছে মায়ের দল, বুকেতে বিশ্বাস- ঠিক এভাবে একদিন নিজের ঘরে পৌঁছে যাব। পথের মোড়ে মোড়ে শ্বাপদের মত বিপদেরা অপেক্ষা করছে, ক্ষুধা-ক্লান্তির সাথে আছে রাষ্ট্রীয় উর্দিধারী জুলুমবাজ প্রশাসন। বুকফাটা তীব্র আর্তনাদে আকাশ বাতাস উদীরিত। এই দূঢ়হ মহাসঙ্কটের করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে না পারুক, মৃত্যুটাও যদি আপন ভিটেতে হয়- তাতে মরেও শান্তি পায়। বেহায়া রাষ্ট্র বর্বরের মত তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে খবরের কাগজে, টিভিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায়- মনোরঞ্জনের নতুন সংযোজন।

হায়রে গণতন্ত্র; আয়নাতে যদি তুমি নিজের মুখ দেখতে পেতে- দেখতে পেতে ক্রূরতা মাখা নির্দয় মুখখানি কেমন উদাসীন ভাবে পুঁজির দালালিতে মগ্ন, ধিক এই রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধিক। শ্রমিকের, কৃষকের বুকফাটা আর্তনাদে লজ্জিত আমাদের পবিত্র ভারতভূমি। সব লিখে রেখো তোমার প্রতিটি ঘামের বিন্দু দিয়ে রক্তলেখায়, তুমি এর প্রতিশোধ নিতে ভুলোনা।

“যারা রক্তে, ঘামে সভ্যতার রথের রশি টানে
তাঁদের রথের চাকায় পিষে মরতে হয়…”

Tanmay Haque

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *