ইসলামঃ করোনাকালের যাকাত, কমিউনিটি কিচেন ও পরিযায়ী শ্রমিক

পবিত্র কোরানের ‘সুরা আল-ইমরানের’ ৯২ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন- “তোমরা কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবেনা, যদিনা তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে দান করো”। কষ্টার্জিত অর্থের চেয়ে মানুষের প্রিয় বস্তু আর কি হতে পারে সাধারনভাবে?

ইসলামে ‘দান’ হল একপ্রকারের প্রার্থনা, যা বিকল্পহীন অবশ্য পালনীয়।

রমজান মাস ত্যাগের মাস, ইসলাম ধর্মাবলম্বী ‘মোমিন ইমানদারেরা’ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ‘পানাহার ও যৌনতা’ পরিত্যাগ করেছে দিবাভাগে। রমজান ‘সবর বা ধৈর্যের’ মাস, রমজান মাস ইবাদত বা প্রার্থনার মাসও বটে। মোহাদ্দেস তথা ইসলামিক পণ্ডিতেরা বলেন- এই মাসের দান বাকি ১১ মাসের দানের চেয়ে ৭০ গুণ উত্তম, যার নেকি তথা পূণ্যিও ততোধিক।

আমরা অনেকেই সম্মানিত ব্যাক্তিদের অনেকসময় নানান ধরনের উপঢৌকন দিই, সেগুলোকে ইসলামের পরিভাষায় ‘হাদিয়া’ বলা হয়, এগুলো সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার তাগিদে প্রদান করা হয়ে থাকে। রাসুলাল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে হাদিয়ার বাইরের কোনও প্রকার ধন সম্পদ গ্রহণ করতেননা। সুতরাং, হাদিয়া কখনই দান নয়।

তাই দানের আগে দাতার ‘নিয়ত বা অন্তরের সংকল্প’ বিষয়ে নিজের কাছে স্বচ্ছ থাকা একান্ত জরুরী, নতুবা দান মূল্যহীন। প্রসঙ্গত গোটা ইসলাম বিষয়টাই সংকল্পের উপরে দাঁড়িয়ে, দড়ি, টুপি, সুরমা, আতর, জোব্বা, গোঁফ না রাখা ইত্যাদি সবই বাহ্যিক ও ঐচ্ছিক। তবে হ্যাঁ, দান কখনই বাজারে ঢেঁড়ি পিটিয়ে প্রকাশ করার বিষয় নয়।

পবিত্র কোরানে এসেছেঃ “যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত কর, তবে তা কতইনা উত্তম। আর যদি খয়রাত গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্যে আরও উত্তম। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের কিছু গোনাহ দূর করে দিবেন। আল্লাহ তোমাদের কাজ কর্মের খুব খবর রাখেন”। [সুরা বাকারা ২:২৭১]

ইসলামে দানের শ্রেনী বিভাগ গুলো কি কি?

দান মূলত তিন প্রকার,

১) সদকা বা সাদকাহ হল বিনিময় হীন স্বেচ্ছা দান যা বাধ্যতামূলক নয়; আপনার ইচ্ছা ও সমর্থ মত যা খুশি আপনি দান করতেই পারেন। পবিত্র কোরানে এসেছেঃ “যারা মনের কার্পন্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম” [৬৮:১৬]

২) যাকাত বা বাধ্যতামূলক দান

পবিত্র কোরানে মোট ৩০ বার যাকাতের কথাটি এসেছে, যাকাত ইসলামের মুল যে পাঁচটি স্তম্ভ তার পঞ্চম স্তম্ভের নাম যাকাত। যাকাত শুধু দান নয়, এটা একধরনের ইবাদত বা আল্লাহর আরাধনা করার পন্থা। উৎপাদনক্ষম ও প্রবৃদ্ধিশীল সম্পদ, নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি থাকলেই তার উপরে শতকরা ২.৫০% (আড়াই শতাংশ) মানে ৪০ ভাগের একভাগ সম্পদ আপনি দান করতে বাধ্য।

যাকাত প্রসঙ্গে কোরানের ৫৯ অধ্যয়ের (সুরা হাশর) সপ্তম অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছেঃ “যাকাত গরীব আত্মীয়-স্বজনদের, ইয়াতিমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের দান করুন। যাতে ধনৈশ্বর্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়ে যায়”। তার মানে একই পরিবারের সদস্যদের মাঝে দেওয়া যাবেনা। আরেক ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের (দানের) কথা প্রকাশ করে এবং গ্রহীতাকে কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাত বরবাদ করোনা সেই ব্যক্তির মত, যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে” (সুরা বাকারা, ২৬৪); অর্থাৎ বার্তা খুব পরিষ্কার- দান করে খোঁটা দেওয়া, ও ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রচারণা করা অত্যন্ত গর্হিত পাপাচার।

যাকাত না দেওয়া সম্পদ ততটাই হারাম যতটা পরনারীর/পুরুষের সাথে অবৈধ যৌনসঙ্গম করা বা শূকরের মাংস খাওয়া। বরং এটি সুদের সমতুল্য। ইসলাম বলছে সুদ আপনাকে সম্পদকে ধ্বংস করে দেবেই।

একটা চন্দ্র বছরে খাওয়া-পরার পর যতটা সঞ্চয় হয়, তার ৪০ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে বাধ্য, যদি সে ইসলামকে মেনে চলে। সেটা ১০০ টাকা সঞ্চয় হলেও দিতে হবে ১০০ কোটি হলেও তাই। দেশের সরকারকে দেয় ট্যাক্স বা কর কখনই যাকাত নয়, বরং ওটা বাদ দিয়েই যাকাতের হিসাব হবে। এছাড়া ৫২.৫০ ভরি রুপো বা ৭.৫ ভরি সোনার অতিরিক্ত সোনা থাকলে সেই অতিরিক্ত পরিমাণের উপরে যাকাত লাগু হয়ে যায় ওই ২.৫% হারে। অর্থাৎ এই বছর যাদের ঘরে সাড়ে সাত ভরির বেশি সোনা আছে, প্রত্যেককে আজকের হিসাবে ১৪২১ টাকা প্রতি ভরি হারে যাকাত দিতে হবে, নতুবা তা সুদ হিসাবে গন্য হবে। আল্লার প্রতি ইমান, নামাজ, রোনা, হজ্বের পাশাপাশি যাকাতও অবশ্য কর্তব্য, যার কোনও বিকল্প নেই ইসলামে। এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী পুত্র কন্যা পিতা মাতা প্রত্যেকের একাউন্ট আলাদা, দুজনের মিলিয়ে যদি দশভরি সোনা থাকে ৫-৫ ভরি করে, তাহলে তা জাকাতের আওতাতে আসবেনা। ১৭/০৫/২০২০ তারিখে সোনার দাম- ৫৬৮৬১ টাকা ভরি, ৪৮৭৫ টাকা প্রতি গ্রাম হিসাবে। অনেকের লোন থাকে, সেক্ষেত্রে কোনো মুফতির কাছ থেকে সঠিকটা জেনে নেবেন।

যাকাতের অর্থরাশি কাকে দেবেন অর্থাৎ এর হকদার বা মালিক কারা?

কোরান বলছে, ‘যাকাত হচ্ছে আল্লাকে ঋণ দেওয়ার সমতুল্য, যার প্রতিদান তিনি নিজে দেবেন’, (২;২৪৫)। কোরানের নবম অধ্যয়ের (সুরা তাওবা) ৬০ তম অনুচ্ছেদে (আয়াতে) বিষদে বর্ণনা রয়েছে, কারা জাকাতের হকদার। গরীব, এতিম (অনাথ), ফকির, মিসকিন (সহায় সম্বলহীন), মুসাফির (মানে যারা পথে রয়েছে), পরিশোধে অক্ষম ঋনগ্রস্থদের জন্য, যাকাত আদায়কারী ব্যাক্তি, দাস মুক্তির জন্য এবং যারা আল্লার রাস্তায় নিজেকে সমর্পন করেছেন তাদের মাঝে বিতরণ করা বাধ্যতামুলক এই যাকাতের অর্থরাশি।

৩) ফিতরা

গোটা শব্দটা হল ‘সদাকাতুল-ফিতুর’, যার বাংলা প্রতিশব্দ পবিত্রতা। সম্পদকে পবিত্র করার জন্য এটা দান করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে হাদিসে, যা বাধ্যতামুলক নয়। ঈদের দিন যেন কোনো গরীবের হাঁড়ি খালি না থাকে- এই উদ্দেশ্যে ফিতরা দানের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এক্কেবারে হতদরিদ্র ছাড়া, যে ব্যাক্তির কাছে একটি গোটা দিন একটি রাত্রের জন্য খাদ্যদ্রব্য মজুদ আছে, সে যেন ফিতরা দান করে তার চেয়েও গরীব কাউকে। এক্ষেত্রে সরাসরি খাদ্যশস্য দেওয়া সর্বোত্তম, যেটার পরিমাণ হচ্ছে আরবি পরিমাপ এককে ১ স্বা পরিমাণ; কেজিতে করলে যা দাঁড়ায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম মতন। গমের খুচরো মূল্য হিসাবে যা ৭০ টাকা মত দাঁড়ায় আজকের দিনে।

সদগা আপনি যা খুশি দিতে পারেন, কিন্ত ধনসম্পদ থাকলে যাকাত আপনার জন্য ফরজ, না দিলে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে ইসলামে। সম্পদ থাকলে আপনি যাকাত দিতে বাধ্য- নতুবা আপনি যা খুশি হন, নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করতে পারেননা, মুসলমান হওয়ার পঞ্চ শর্তের অন্যতম এই যাকাত, নতুবা আপনি মুসলমানই নন। আর ফিতরা হল আপনার কোমলমতি হৃদয়ের পরিচয়।

ইসলামিক নিয়ম ঘ্যেটে দেখা গেলো, যাকাতের প্রকৃত পাওনাদারের মধ্যে অনাথ, সম্বলহীন, ভিক্ষুক, অসহায় ও পথিকশ্রনীর মানুষ শীর্ষস্থানীয়। অন্যান্য বছরগুলোতে যাকাতের বেশিরভাগ অংশটি হয়ত মাদ্রাসাতে থাকা ছাত্রদের জন্যই ব্যায় করতেন আপনি, কারন মাদ্রাসাতে মূলত যারা পড়ে তাদের সিংহভাগই উপরোক্ত শ্রেনীর, যেগুলো আমার-আপনার কাছ থেকে কিছু বেকার ছেলে সংগ্রহ করে নিয়ে আসত গোটা পৃথিবী জুড়ে, যাদের যাকাত আদায়কারী বলায় হয়।

বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব মাদ্রাসাই বন্ধ লকডাউনে, বাচ্চারা যে যার যার বাড়িতে অর্থাৎ মাদ্রাসাতে এই মুহুর্তে খরচা প্রায় নেই বললেই চলে, তদুপরি আদায়কারিরাও আপনার কাছে যেতে পারেনি পরিবহন ব্যবস্থার কারনে। এমনকি এবছর লকডাউনের প্রকোপে গরীবরাও অনেকে যেতে পারবেনা আপনার দুয়ারে। এদিকে সঠিক স্থানে যাকাত পৌঁছে দিতে আপনি বাধ্য; তাহলে আপনি যাকাত কাকে বা কোথায় দেবেন?

নিশ্চই আপনি আপনার প্রতিবেশী গরীবদের মাঝে দিন, আপনার দানে তাদের হক সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এবারে আরো অন্তত ৩টে প্রজাতি রাষ্ট্রের কল্যাণে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে, যাদের অন্য অনেক সময় একত্রে এভাবে পাওয়া যায়না। “মুসাফির, সহায় সম্বলহীন ও অভাবগ্রস্থ”, এই তিনটে শব্দকে একটা বন্ধনীতে জুড়লে যে প্রতিশব্দটা দাঁড়ায় তার নাম হল “পরিযায়ি শ্রমিক”।

মাত্র ৪ ঘন্টার নোটিশে জারি হওয়া অপরিকল্পিত লকডাউনের অভিশাপে, বিদেশ বিভূঁইতে থাকা শ্রমিকশ্রেণীর মানুষগুলোর বর্তমানে রোজগার নেই- মানে তারা ‘অভাবগ্রস্থ’; রাষ্ট্র বা কর্পরেটের কেউ তাদের দেখার নেই- মানে ‘সহায়সম্বলহীন’, বালবাচ্চা নিয়ে পথে পথে হেঁটে চলছে হাজার হাজার কিমি- মানে তারা ‘মুসাফির’। দান বিষয়ে ইসলামের এমন ‘কপিবুক’ স্টাইলের সুযোগ কিন্তু বারে বারে আসবেনা আপনার কাছে। অতএব অনুরোধ, যদি পারেন নিজে ওই শ্রমিকদের হাতে পৌঁছে দিন আপনার দান। যদি সেই ক্ষমতা না থাকে তাহলে যারা বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে ‘কমিউনিটি’ সাহায্য বিলোচ্ছেন, সেই মানুষগুলোর মাধ্যমে আপনার দান পৌঁছে দিন। ইসলাম ধর্মমতে আপনার আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাবার বা তাঁকে উত্তম ঋণ দিয়ে (কোরানের ভাষ্যে) পুণ্যি কামবার এমন সুযোগ কিন্তু বারে বারে আসেনা।

তাই আমার তরফে অনুরোধ, আপনার যাকাতের একটা অংশ এই কমিউনিটি কিচেন গুলোর জন্য বরাদ্দ করুন। আপনার ধর্মে কোথাও বলা নেই, স্বধর্মের গরীব, মিসকিন বেছে বেছে দান করুন, তাই জাত ধর্ম না দেখে অভাবী মানুষকে দিন, যার খিদে আছে পেটে। আপনি নেকি বা পূন্যি অর্জন করুন, আর অসহায় গুলো আপনার ধর্ম বিশ্বাসের সুফল ভগ করুক সরাসরি, এর চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে?

আপনার প্রতীক্ষাতে রইল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো, যারা পরিযায়ী শ্রমিক বা কমিউনিটি কিচেনের সাথে যুক্ত।

বিঃ দ্রঃ- আমি কোনও আলেম নই, তাই ইনিচ্ছাকৃত যেকোনো ত্রুটি মাফ করে দেবেন। আমার জন্য দোয়া করবেন।

আসসালামু আলাইকুম।

3 comments on “ইসলামঃ করোনাকালের যাকাত, কমিউনিটি কিচেন ও পরিযায়ী শ্রমিক”

  1. Kiamul Shaikh Reply

    অসাধারণ উদ্যোগ আমরা পাশে আছি।

  2. Shahnaz Alam Reply

    সার্বিক বর্ণনা। অনেকে উপকৃত হবেন।

  3. M. Mandal Reply

    প্রয়োজনীয় লেখা। খুব সুন্দর হয়েছে। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *