বসিরহাটে কেন? কেন তমলুক বা হলদিয়া নয়?

উম্পুন পরবর্তী বাংলা আজ ৭২ ঘন্টা অতিক্রান্ত প্রায়, গোটা দক্ষিণবঙ্গের চিত্রটা একটা ইতস্তত ধ্বংসস্তুপের মত।

সর্বত্র পানীয় জলের হাহাকার, অধিকাংশ বাড়িতেই চাপা কল নেই, পাম্পের ভরষাতে সকলে। জল তুলতে গেলে ইলেকট্রিসিটি দরকার যেটা নেই। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কারন বিদ্যুতের অভাবে ফোনে চার্য নেই, কোথাও আবার টেলিফোনের টাওয়ারই নেই- উড়ে গেছে বা দুমরে মুচরে পরে রয়েছে। এক লহমাতে ত্রিশ বছর পিছিয়ে গেছে বাংলার গ্রামাঞ্চল। শুধু গ্রামাঞ্চলই বা কেন, বিস্তীর্ন শহরতলী তো বটেই খোদ কোলকাতারই স্থানে স্থানে অবরোধ শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ এর দাবীতে। সল্টলেকে গাছ সরানো হয়নি রাস্তা থেকে, ডায়মন্ড হারবার রোড জুড়েও অব্যবস্থা চূড়ান্ত পর্যায়ের, যাদবপুর, এয়ারপোর্ট অঞ্চল সর্বত্রই দৈন দশা। কারন স্বরূপ যেটাকে প্রাথমিক ভাবে দেখা যাচ্ছে, বিগত পুরসভা বোর্ডের সদস্যরা যারা এবারে টিকিট পাবেনা বলে স্থির চূড়ান্ত তাদের আর এলাকাতে দেখা যাচ্ছেনা, ডিলিমিটেশনের ফলে অনেক ওয়ার্ড মহিলা বা তফসিলি জাতিদের জন্য সংরক্ষিত হয়ে গেছে, তাই কারর কোনও গা নেই তেমন- এটাই কোলকাতার মূল চিত্র।

ঝড় এলে ক্ষয়ক্ষতি হয়, এ তো স্বাভাবিক- কিন্ত্যু রাজ্যপাল থেকে রাজ্য সরকার- তারা যে গলা উঁচিয়ে এতদিন ধরে প্রচারণা করে বেড়ালো যে তারা প্রস্তুত, সেই প্রস্তুততার নমুনা কোথায়? ঘটা করে সাংবাদিক সম্মেলন আর প্রশান্ত কিশোরের বানানো মেমে-শ্লোগানে মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক লাভ সুনিশ্চিত করলেও, মানুষের প্রয়োজন পূরণ হয়না- তা প্রমাণিত। দিল্লির কথা ছেড়ে দিন, তারা তো খাজনাটুকু আদায় করেই খালাস, বাকিটার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন তৈলমর্দন।

করোনা নামের ক্রান্তিকালে এমনিতেই মানুষ শাপগ্রস্থ, বিগত দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজ্য সহ গোটা দেশের সিংহভাগ মানুষ রোজগারহীন। এ অবস্থায় প্রস্তত থাকার অর্থ মানে তো খাদ্যের যোগান সুনিশ্চিত করা, রোগীর ওষুধ, খাবার জলের পাউচ রেডি রাখা- কিন্তু হা হতোস্মি। কোথাও কিচ্ছু নেই বাগবিড়ম্বনা ছাড়া। বাঁকুড়া পুরুলিয়ার কিছু শখের কলমচি আবার ফেসবুকে লিখছে- ‘এত চাই চাই রব কেন বাবা, ঝড়ে ক্ষতি হয় কি জানোনা’? ‘তাঁদের’ কাছে বলি- তোমরাই বা পিছিয়ে পরা অঞ্চল বলে মড়াকান্না কেন করো আজীবনকাল! খেটে খাও, অনুর্বর জমিতে সোনা ফলাও মুরদ থাকলে। ঘরে বসে ফ্রি-জিও নেট সকলকেই তক্তায় বসা লেখক বানিয়ে দিলে যা হয় আরকি, মানুষ বিপদগ্রস্থ আর কিছু জনের কাব্য বিলাসের সীমা নেই।

সকলেই ভাবছে আমরাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি উম্পুনে, কারন বাকি অঞ্চলের খবর আমরা কেউ জানিনা, সম্ভবত রাজ্য প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তিরাও জানেনা। জানলে তারা ঝড়ের মূল আঘাতের যে জেলা সেই পূর্ব মেদনীপুর ব্যাতিরেকে বসিরহাটে প্রধানমন্ত্রিকে নিয়ে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠক হতনা; এর অর্থ বাস্তবিকিই আমার অন্তত মাথায় ঢোকেনি। শুধু তমলুকেই প্রায় দুঘন্টা ঝড় স্থায়ী ভাবে তান্ডব চালিয়েছিল, পাকাবাড়ি পর্যন্ত ভিত থেকে সমূলে উৎপাটিত করে দিয়েছে অনেক গ্রামে। গ্রামকে গ্রাম সব ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে, তা নিয়ে যেহেতু মুখ্যমন্ত্রির তেমন একটা উদ্বেগ নেই, যতটা দুই ২৪ পরগণা নিয়ে তার আপন ভাষ্য মতে ‘বুক ফেটে যাচ্ছে’; স্বভাবতই কোলকাতার সংবাদমাধ্যম গুলোরও প্রচারণা নেই কলকাতা তৎ-সন্নিহিত অঞ্চল ছাড়া।

আজকাল ইন্টারনেটের দৌলতে ঝড়ের গতিপ্রকৃতি জানতে সরকারের উপরে বিশেষ ভরষা করতে হয়না, বিভিন্ন মোবাইল এ্যাপসই তা জানিয়ে দেয় প্রায় নিখুঁত ভাবে। ঝড়ের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী বসিরহাট পরিদর্শনের বদলে বহরমপুর বা আমাদের সমুদ্রগড় পরিদর্শন করলে চিত্রটা কি আলাদা হত? ঝড় নন্দীগ্রামে আছড়ে পরার পর তা রাজশাহী দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছিল। এর মাঝে বসিরহাট অঞ্চলে কি, এলাকার সাংসদের মত খেমটা ড্যান্সের একটা ক্ষেপ মেরে এসে আবার সে নিজের ট্র্যাকে ফিরেছিল? আসলে বসিরহাটে মানুষ থাকুক বা না থাকুক সেখানে হিন্দু-মুসলমান থাকে এটা নানান দাংগা পরিস্থিতিতে প্রমাণিত; তাই রাজনৈতিক ভাবে ওই অঞ্চলটাতে যাওয়াটা ভীষণ জরুরী। পাশেই বনগাঁ, ভোটের পাখী সেজে মোদী থেকে মমতা সকলেই যে পীঠস্থানে হত্যে দিয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে- তা বহিরহাটের অতি সন্নিকটে।

এটাই আধুনিক ভারতের রাজনীতি, যেখানে রাজনীতি সেখানেই ক্ষমতার কারবারিরা। বিজেপি স্বপ্ন দেখছে মাংলার মসনদ দখলের, তাই গালভরা হাজার কোটির প্যাকেজ ঘোষণা করে দিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। দক্ষিণবঙ্গের ৫ কোটি ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের জন্য মাথাপিছু ২০০ টাকা করে বরাদ্দ, দুর্দান্ত। সন্দেহ হয়, নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণে অভ্যস্ত প্রধানমন্ত্রী কি অদৌ ঝড়ে আক্রান্ত পরিস্থিতি দেখতে এসেছিলেন না দীর্ঘ লকডাউনের একঘেয়েমি কাটাতে একটা লংড্রাইভ মেরে গেলেন তার চরম পছন্দের বায়ুযানে, সাথী হিসাবে প্রতিবছর পাঞ্জাবী রসগোল্লা পাঠানো আমাদের মুখ্যমন্ত্রী।

পূর্ব মেদনিপুর তৃণমূলেরই গড়, বাংলার ‘নবাব’ শুভেন্দু অধিকারীর খাস তালুক- তাই সেখানে গেলে নতুন করে রাজনৈতিক লাভ আর কিই বা পাওয়ার আছে, মমতা ব্যানার্জির মত ধুরন্ধর রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব সেটা জানে। সেখানে মোদিকে সাথে করে নিয়ে যাওয়াটা হয়ত ‘কাঙালকে মুলোর ক্ষেত দেখানো’ হতে পারত- তাই আগেভাগেই সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা জরুরী। অতএব ক্ষয়ক্ষতি যেমনই হোক, পুর্ব মেদনিপুর নৈব নৈব চ।

তবে একটা ভীষণ অপ্রিয় কথা, যা হয়ত অনেকেরই গাত্রদাহের কারন হবে; কর্মফল সকলকেই পেতে হয়- দুদিন আগে হোক বা দুদিন পর। নন্দীগ্রাম বা পুর্ব মেদনিপুরও তার ব্যাতিক্রমি হবে কেন! সারাবাংলার মানুষকে একটা মিথ্যা ধোঁকার মাঝে ফেলে ক্ষমতার যে পালাবদল করেছিল জনগণ, নন্দীগ্রাম ছিল অন্যতম উৎসমুখ সিঙ্গুরের সাথে একযোগে। তাই আজকের এই উপেক্ষা, অব্যবস্থা, প্রতিহিংসা পরায়ণ মানসিকতা মিলিয়ে যে যন্ত্রণাভোগ সবটাই তাদের নিজেদের রোজগার; এখানে তারা অন্য কাউকে দোষারপ করতে পারবেনা। কাঠ খেলে আসবাব বেড় হবেই গুহ্যদেশ দিয়ে।

অতীতের PM to DM ত্বত্ত্বের প্রবক্তা আজ নিজেই ‘আমার সরকারকে’ দিন- বলে হাপিত্যেশ করে রয়েছে। এক্ষেত্রেও ত্রাণ কোথাও সেভাবে পৌঁছায়নি, অতীতের বহু ক্ষেত্রের মত- ঘোষিত ক্ষতিপূরণও অদৌ পৌঁছাবে কিনা তারও ভরষা নেই। পোষ্ট ট্রুথ যুগের রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বদের থেকে অবশ্য এর চেয়ে বেশি আশা করাটাই অন্যায়, তার উপর কেন্দ্র হোক বা রাজ্য- দু ক্ষেত্রেই মিথ্যার জাহাজে চড়ে ক্ষমতা দখল করেছিল বর্তমানে শাসকদল। মিথ্যা গিমিকের সিঁড়ি বেয়ে যারা ক্ষমতায় পৌঁছেছে, তারা কেন গঠনমূলক কাজ করবে জাতির জন?

মন্দির, স্ট্যাচু, তিনি তালাক বিল, নোটবন্দী, কাশ্মীর হয়ে হিন্দুরাষ্ট্র হলেই তো আমাদের সংখ্যাগুরুরা তুষ্ট; অন্য দিকে মেলা, খেলা, উৎসব, ক্লাবে দান, কার্নিভ্যাল নিয়ে আপনারাই তো এতদিন মেতে ছিলেন। একদিকে হিন্দুরাষ্ট্রের ভয়ে সিটিয়ে থাকা সংখ্যালঘুরা মমতাকে পীর হিসাবে মেনে নিয়ে সমর্থন উজার করে দিয়েছে, অতএব মেরুকরণ সম্পূর্ণ করলে আপনি নিজেই- সংখ্যা (গুরু-লঘু) নির্বিশেষে; আজ মনে পরল যে হাসপাতালে বেড নেই! দুর্যোগে হলে আমরা অসহায়? পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা? আমরা নিজেরাই তো আমাদের উত্তর প্রজন্মের সাথে প্রহসন করেছি উন্মাদদের ক্ষমতায় বসিয়ে; সেখানে এদের থেকে প্রহসনই আশাজনক, প্রশাসন নয়। এই সকলের দায় আপনাদের, আমার- আমাদের সকলের।

রাজ্যপালের মত কেউ কেউ ‘নূন্যমত’ ক্ষতি হয়েছে বলার পর তার রাজনৈতিক আদর্শে দীক্ষিত ভক্তকুল ‘নূন্যতম’ প্রমানে মরিয়া। ঠিক কতটা ক্ষতি হলে ‘পর্যাপ্ত’ বলা যেতে পারে? কোলকাতার চিত্র তো তবুও পরিষ্কার, সুন্দরবনের নদী বাঁধে তেমন ক্ষতির আঁচ পৌঁছায়নি, কিন্তু ভেরির মাছ চাষিদের মাথায় হাত- ৪ মিটারের জলোচ্ছাসে ভেড়ির মাছ হোক বা চাষের ধান সবই ভেসে গেছে- এগুলো ক্ষতি নয়? আক্রান্ত এলাকাতে লক্ষ লক্ষ বাড়ির ছাদ নেই, গাছেদের মড়ক হয়েছে, জমির ফসল জলের তোড়ে ভেসে গেছে, অগনিত মানুষ ভিটে হীন, নদীপথের জেটি ভেঙেছে, জঙ্গলের ফেন্সিং ছিঁড়েছে এগুল সবই নূন্যতম। রাস্তায় যানবাহন নেই, রাজারহাটের এক বন্ধু তার সাগরদ্বীপে থাকা বাবা-মায়ের খোঁজ টুকু পাননি এই ৩ দিনে- এটাও নূন্যতমই- কারন কবে খোঁজ পাবে কেউ জানেনা।

বাস্তবিকিই এগুলো সবই নূন্যতম, কারন আমাদের ‘জনগণের’ নূন্যতম রাজনৈতিক জ্ঞানের অভাব, আমরা যারা ভোট দিই। সস্তার প্রলোভনে বিক্রি হয়ে গিয়ে অযোগ্য মূর্খদের রাজক্ষমতা দান করে তাদের থেকে সোনা ফলবে সে আশা করাটাই তো সবচেয়ে বড় মূর্খামি ও অপরাধ, আর আমরা এটাই করছি।

যাদের ‘ভাল ও মন্দ’, ‘সত্য ও মিথ্যা’, ‘সৎ ও দুষ্কৃতী’, চিনতে অক্ষমতা প্রমাণিত বারেবারে, দুর্যোগকালে তাদের দুঃখে যে কুকুর শেয়াল কাঁদবে তাতে আর আশ্চর্য কি?

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *