নীলিনায়িত অভিবাসীঃ বাঙালীর ভাষা

প্রতিটি জীবই তার মনের ভাব বিনিময় করে থাকে নিজস্ব উপায়ে, আর এভাবেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ- তার অন্তরের ভাব বিনিময়ের জন্য ভাষার সূচনা করেছিল সভ্যতার আদি লগ্নেই। তার আগে হরেক অঙ্গভঙ্গি, ইশারা ও বিচিত্র একআধটা শব্দ দিয়ে মানুষ তার মনুষ্যত্তর জীবনের যাত্রা শুরু করেছিল, ঠিক যেমন একটি শিশু একটা একটা করে বুলি শেখে আজও। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে, নানান জাতি, নানান গোষ্ঠী, হরেক গোত্র তারা নিজেদের মত করে ভাষার উদ্ভব করেছে প্রতিটি যুগে। ভাষা যেহেতু ভাব প্রকাশের মাধ্যম, তাই প্রতিটি জাতির সংস্কৃতিক স্বত্তা প্রস্ফুটিত হয়েছে আপন ভাষার মাধ্যমে। ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের স্বাক্ষর, ভাষার স্বতন্ত্রতা বহমান কৃষ্টির খোশনাম; তাই তো মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সম্মাননা দেওয়া হয়, কতশত প্রাণের আহুতি দিয়ে মানুষ তার নিজস্বতা বজায় রাখে ভাবপ্রকাশের সর্বৎকৃষ্ট মাধ্যম ভাষার জন্য।

ভাষা বহমান নদীর মত, ছোট্ট উৎস থেকে জন্ম নিয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে ও একসময় তা সময়ের সমুদ্রে পতিত হয়ে নিজস্বতা হারিয়ে ইতিহাসে বিলীন হয়ে যায়। প্রতিটি ভাষা কোনোনা কোনো আদি মূল ভাষা হতে জন্ম নিয়েছে, এরপর সময়ের সাথে সাথে হরেক সংস্কৃতি, জাতি, গোষ্ঠী, ব্যাক্তির সংস্পর্শে এসে সেই ভাষায় অল্প অল্প করে সংমিশ্রণ ঘটতে থাকে; ভাষা ঋদ্ধ হয়, উদবর্তীত হয়। একসময় কালের নিয়মে সেই ভাষা হারিয়েও যায়। গোটা বিশ্বজুড়ে এমন হারিয়ে যাওয়া ভাষারা আজও ইতিহাসের বুকে সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে শিলালিপিতে, দেওয়ালচিত্রে, প্যাপিরাসে, পুস্তকে; যারা একসময় বিপুল ব্যাপ্তি পেয়েছিল তৎকালীন সমাজে। অনেকেই ভাষাকে কুক্ষিগত করে আঁটকে রাখতে চান, তাঁরা নেহাতই গণ্ডমুর্খ; কারন ভাষা আত্মার যাথে জড়িত- আর আত্মার উপরে জবরদস্তি চলেনা। সংকীর্ণতা গোঁড়ামির চোরাবালিতে কালের নিয়মেই অতলে তলিয়ে যায় অতি দ্রুত।

ভারতীয় পুরাণের কাহিনী থেকে ভাষার ইতিহাস খুঁজতে গেলে সেই আর্যদের ইতিহাসের গভীরে যেতে হয়। নর্ডিক(!) জাতিগোষ্ঠীর মানুষ আর্যরা ছিল ককেশাস ও স্তেপ অঞ্চলের বাসিন্দা, কারন বেদে বার্চ গাছের ছালের উল্লেখ রয়েছে যা ওই অঞ্চলেই পাওয়া যায়। উত্তর-পশ্চিম ইউরেশিয়া অঞ্চল থেকে আর্যরা তৎকালীন আনাতোলিয়া, পারস্য, খোরাসান, মেহেরগড়, হরপ্পা হয়ে আজকের ভারতীয় মূল ভুখন্ডে প্রবেশ করেছিল বলে অনুমান করা হয়। আর্যদের রচিত বৈদিক সাহিত্য ও পার্শিদের ‘জেন্দ-আবেস্তা’ প্রায় সমসাময়িক কালেই রচিত; যাদের মাঝে আশ্চর্যজনক ভাবে মিল পরিলক্ষিত হয়। স্বভাবতই ভারতীয় সংস্কৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব আজকের নতুন বিষয় নয়।

এর পাশাপাশি আরও কিছু তথ্য রয়েছে, যেগুলোর অখণ্ডনীয় ঐতিহাসিক সত্যতা না থাকলেও মধ্যযুগীয় কিছু পার্শি ও ইসলামিক পণ্ডিতদের মতে- প্রফেট নোয়া তথা নুহ (আঃ) নবীর এক সন্তানের নাম ছিল ‘আল’, যার সন্তানের নাম ছিল হিন্দা; হিন্দার পুত্রের নাম ছিল বাং। এদিকে আল নামক আরবি শব্দের শব্দগত অর্থও হচ্ছে বংশধর, অনুমান করেন বাং ও আল শব্দ থেকেই বাঙ্গাল বা বাঙলা শব্দের সৃষ্টি। প্রসঙ্গত ইসলামী উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা মু’য়াবিয়ার মা তথা তথা নবী মুহাম্মদ(সাঃ) এর গুরুত্বপুর্ন সহচর- আবু সুফিয়ানের স্ত্রীর নাম ছিল হিন্দা। বর্তমানে এই আবু সুফিয়ানের বংশধরেরা হচ্ছে সিরিয়ার ‘আসাদ’ পরিবার। তো সে যাই হোক, ভাষা চর্চাতে ফিরি-

আজকের পৃথিবিতেও কমবেশি ৭০০০ এরও বেশি ভাষা রয়েছে, যদিও কয়েকটি ভাষার দাপটে প্রতিমাসেই একাধিক ভাষা কালের অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে বলে দাবী করেছে ইউনেস্কোর এক বিশেষজ্ঞের দল। মন্দারিন (১১.৯০%), হিস্পানিয় (৬%), ইংরাজি (৫%), ও হিন্দির (৪.৫০%) পরেই আমাদের বাংলা ভাষা- যা প্রায় ৩ শতাংশ মানুষের প্রাণের ভাষা এই বিপুলা পৃথিবীর সর্বমোট জনসংখ্যার নিরিখে।

পৃথিবীর সাংস্কৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদেই ভাষার বৈচিত্রকে সংরক্ষণ করে টিকিয়ে রাখাটা সভ্যতার ব্যাক্তিগত দায়। নতুবা বর্তমানের বহুল ব্যবহৃত ভাষাগুলোও একসময় হারিয়ে যাবে সেই পথে, যে পথে দৈনন্দিন ব্যবহারিক কাজে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে গ্রিক ভাষা, মিশরীয় কোপ্তিক ভাষা, গ্যালিক-সুমেরিয়ান-আক্কেদিয়ান-ব্রাহ্মী-পালি-প্রাকৃত ইত্যাদি ভাষারা। লাতিন ভাষা, বাইবেলে ব্যবহৃত হিব্রু ভাষা সহ আমাদের সংস্কৃতও একটা অতি ক্ষুদ্র গণ্ডিতে এসে আবদ্ধ হয়ে গেছে।

শব্দকোষ আর লিপির ফারাকে দুটো আলাদা ভাষা হিসাবে জন্ম নিয়েছিল হিন্দি এবং উর্দু, যারা প্রায় অভিন্ন। এভাবেই ভাষারা তার নিজস্ব গতিপথ তৈরি করে নেয় আপন প্রয়োজনে। বাংলা ভাষাতেও বহু বিদেশী ভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে কালেচক্রে। একে নব্যভারতীয় ইন্দো-আর্য ভাষা বিভাগের মধ্যে ফেলেন অধিকাংশ ভাষাবিদ, মনে করা হয় এর উদ্ভব ঘটেছিল ৬০০ থেকে ৭০০ খ্রীষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে, ‘মাগধী প্রাকৃত’র ‘পূর্বী অপভ্রংশী’ ভাষা থেকে। পূর্বী অপভ্রংশ থেকে মগহী, মৈথিলী ও ভোজপুরী নামের তিনটি বিহারী ভাষা সহ বাংলা, অসমীয়া ও ওড়িয়া- এই তিনটি গৌড়ীয় ভাষাও জন্ম নিয়েছিল। চর্যাপদ, ভক্তিমূলক গানের প্রাচীন বাংলাভাষা- মধ্য যুগীয় বাংলায় উত্তীর্ন হয়েছিল চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও সমসাময়িক নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে। ততদিনে শুরু হয়ে গেছে বাংলা ভাষার উপরে প্রতক্ষ্য বিদেশী সভ্যতার সমপৃক্ততার প্রভাব। মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জনজাতিরা ও পরে ইউরোপীয় বনিক ও ঔপনিবেশিকেরা তাদের ভাষা সাথে করে এনে অনেকে বাংলাতে লীন হয়ে হয়ে ভাষাকে সমৃদ্ধশালী বানিয়ে দিয়েছে।

আজকের যে বাংলাভাষা সেই আধুনিক ধারার সূচনাকাল মোটামুটিভাবে ঊণবিংশ শতাব্দীর এক্কেবারে আদিলগ্নে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এই সময় থেকেই বাংলার শব্দভাণ্ডারে থাকা আদি সংস্কৃত শব্দের সাথে সংমিশ্রণ ঘটে আরবি, ইরানিয় ফার্সি, তুর্কি, ওলন্দাজ, পর্তুগীজ, ইস্পানীয়, ফরাসি, পোস্তু ও ইংরাজি সহ বহুবিধ বিদেশী শব্দের। প্রায় সোয়া লাখ বাংলা শব্দের মধ্যে অন্তত ২০ হাজার আরবি-ফার্সি শব্দ রয়েছে স্বনামে বা সামান্য বিবর্তিত হয়েছে, এছাড়া ইউরোপীয় শব্দ আছে হাজার চারেক, তুর্কি শব্দ আছে শ’পাঁচেকের কাছাকাছি। এছাড়াও বহু ভাষা থেকে দু-দশটা করে শব্দ দিনেদিনে বাঙালীয়ানার মজ্জায় ঢুকে গেছে।

সুদীর্ঘ ইসলামিক শাসনের সুবাদে বাঙলাতে প্রভূত পরিমাণে আরবি ও ফার্সি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। প্রশাসনিক ও আইন-আদালত সম্পর্কীয় শব্দে- ‘আর্জি, আলামত, উকিল, এজলাস, কসম, কানুন, খারিজ, মৌজা, মহকুমা, রায়, হাজত’ ইত্যাদি আরবি শব্দ বাংলা শব্দকোষে ঢুকে গেছে। ধর্মগত শব্দ গুলো ছাড়াও, শিক্ষা সংক্রান্ত বহু শব্দ আরবি জাত, যেমন- ‘উস্তাদ, কলম, কিতাব, কুর্সি, খাতা, তর্জমা, দাখিল, দোয়াত, মুন্সি’ ইত্যাদি। ‘গরীব, খেয়াল, খবর, জমা, জিনিস, দুনিয়া, ফকির, বাতিল, সাহেব, জবাব, খালি, ওজন, আসল, গায়েব, নগদ, বাকি, হাজির’ ইত্যাদি বিবিধ শব্দের সাথে সংস্কৃতি বিষয়ক শব্দ- ‘আক্কেল, আদব, আদাব, আতর, কবর, কিসমত, খাস, তাজ্জব, তালিম, দুনিয়া, বিদায়, মজলিস, মঞ্জিল, মাহফিল’ শব্দগুলো বাঙলাতে বহুল ব্যবহৃত। এছাড়া আম (আমজনতা), গড় (গড় হাজির) ইত্যাদি উপসর্গ শব্দগুলোও আরবি।

প্রাচীন পারস্যের আবেস্তীয় ভাষা, যা বর্তমানে ইরানে ফার্সি নামে বহুল প্রচলিত ভাষা; আফগান অঞ্চলের দ্যারিয়্যু ও পামির অঞ্চলের তাজিখ ভাষা প্রায় এই ফার্সি ভাষারই অনুরূপ। প্রাচীন বাংলায় নৌ-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও নাবিকদের সাথে সাংস্কৃতিক লেনদেন গড়ে ওঠেছিল, প্রাচীন পারস্যও তার ব্যাতিক্রম ছিলনা। বাণিজ্যপণ্যের পাশাপাশি সৈন্যবাহিনী, প্রকৌশলী, কারিগর, সুফি, দরবেশ এবং বিভিন্ন আঙ্গিকের শিল্পীদেরও আগমন ঘটেছিল বাংলায়। বাংলার শব্দকোষে যার মেয়াদী প্রভাব পরেছিল, এরপর ইসলামী সভ্যতার মূল ও ব্যপক অংশটা উপরোক্ত- ‘ইরান, আফগান ও তাজিখ’ এই তিনটে অঞ্চল বেয়েই মূল ভারত ভূখন্ডে প্রবেশ করেছিল, স্বভাবতই প্রায় প্রতিটি ভারতীয় ভাষাভাষী সংস্কৃতিতে এই ফার্সি ভাষার ব্যাপক প্রবেশন ঘটেছিল, বাংলাও যার ব্যাতিক্রম নয়।

‘হুঁশিয়ার, চশমা, মেজাজ, রকম, হজম, নাগাদ, লাগাম, লোভ, নতুন, নজর, রসদ, হালনাগাদ, হল্লা, তোষক, আদমি, হুজুকে, আমদানি, রফতানি, জানোয়ার, জিন্দা, নমুনা, বদমাস, হাঙ্গামা,’ ইত্যাদি শব্দগুলোর সাথে বিভিন্ন প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও ফার্সি শব্দেরা নিজেকে বাঙালী করে নিয়েছে, যেমন- ‘দপ্তর, তারিখ, দস্তখত, নালিশ, মেয়াদ, হুজুর, জবানবন্দি, দরবার, মোর্চা’ ইত্যাদি। আবার ‘দোকান, খরিদ্দার, দড়, দাম, রেজকি, মুনাফা, কারখানা, মেহনত, ধন-দৌলত, বাদশাহ, বান্দা, বেগম, মেথর’ শব্দগুলোও ফারসি থেকে আমদানিকৃত। ‘আয়না, কাগজ, গরম, পর্দা, বাগান, আস্তে, রাস্তা, বদ, মতলব, খুব, পছন্দ, রোজ, আন্দাজ, আওয়াজ, আরাম, হারাম’ এর পাশাপাশি সলামিক ধর্মবিষয়ক শব্দে গোটা ভারত উপমহাদেশে যেগুলো আরবি শব্দ নামে পরিচিত আসলে সেগুলো খাঁটি ফারসি শব্দ, যেগুলো কোরান হাদিশে উল্লেখই নেই, কিন্তু ‘জরথুস্ট্রীয়’ জিন্দা-আবেস্তায় বিলকুল রয়েছে। যেমন- ‘খোদা, গুনাহ, দোজখ, নামাজ, পীর, পয়গম্বর, ফেরেশতা, বেহেশত, রোজা’ ইত্যাদি। প্রসঙ্গত মাথার ফেজ টুপি ও পুঁতির তসবিও এই পারস্য সভ্যতার স্মারক, ইসলামিক সভ্যতার নয়।

বিভিন্ন রঙের নাম যেমন- ‘লাল, সাদা, আসমানী, বাদামি, সবুজ, গোলাপী’ শব্দগুলো খাঁটি ফারসি শব্দ। এগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রত্যয় যুক্ত শব্দ, বাংলার সাথে জুড়ে একধরণের যৌগিক শব্দ তৈরি করেছে, যথা- দার (তালুকদার, জমাদার, হাবিলদার, চৌকিদার ইত্যাদি), বাজ (জাঁহাবাজ, দুর্নীতিবাজ, ধোঁকাবাজ ইত্যাদি), বন্দী (নজরবন্দী, জবানবন্দী, কারাবন্দী ইত্যাদি), সই (মানানসই, চলনসই, টিপসই ইত্যাদি), চি (কলমচি, তবলচি ইত্যাদি), নবীশ (শিক্ষানবীশ, নকলনবীশ ইত্যাদি)

এছাড়া কিছু শব্দ আছে যেগুলো আরবি ফার্সি দুই ভাষাতেই রয়েছে, যেগুলো বাংলাতে কৃতঋণ ভাষা হিসাবে ঢুকে গেছে, যথা- ‘পোলাও, অছিলা, জ্যান্ত, দেওয়াল, জবরদস্তি, পাঁজা, তরফ, ফতুর, জমি, প্যাঁইতাড়া, জাইগা, খতম, মিহি, খ্যাসারত, ক্যাদ্দানি, কয়াল, জৌলুস, গরজ, মিছরি, কারচুপি, দানা, পোস্ত, উয়ার (লেপ কাঁথার), পেঁয়াজ, আদায়, ফারাক, দেমাক, পয়মাল, কাতার, আলবাৎ, বস্তা, বোড়া, বুজরুগি, খবিশ, আলিশান, দেদার, খয়রাত, আসান, লাট্টু, সবক, ফ্যাসাদ, কিল, জরুরী, খানকা, দেদার, ফানুস, কারচুপি, জেদ, তোড়া, কুলুপ, তামাম, পয়দা, গোস্ত, শাদি, সানাই, কেচ্ছা, খানকি, খামোখা, ব্যাজার, খিল, খেয়াল, খঞ্চা, চুপ, কাছারি, তবক, তৈরি, দোহায়, নাকাল, তরফ, মুরোদ’ ইত্যাদি।

তৎকালীন আনাতোলিয়া বা আজকের তুরস্কের কিছু তুর্কি শব্দও বাংলায় ঢুকে গেছে, যথা- ‘বাবুর্চি, দাদা, বাবা, বেগম, চকচকে, উজবুক, কাঁচি, বোঁচকা, কোর্মা, বিবি, তাগড়াই, চমকা, কল্কে, চাকু, ভাগাড়, মুচলেকা, তোপ, আলখাল্লা, খাতুন, চাকর, বারুদ, সুলতান, শিকার, দারোগা’ ইত্যাদি।

পেদ্রো আলভারেজ থেকে ভাস্ক-দ্যা-গামা হয়ে আজকের ক্রিশ্চিয়ান রোনাল্ডোর দেশ পর্তুগাল কিন্তু বাংলা ভাষাকে বিপুল পরিমাণে সমৃদ্ধ করেছে। ঘরের- ‘কামরা, বারান্দা, জানালা, চাবি হয়ে আসবাবের কেদারা, আলমারি’ শব্দগুলো তাদেরই দান। ‘পিপে, পিরিচ, বাসন, প্লেট, বালতি, গামলা, বোতল, বয়াম, ট্যাঙ্কি, সাগু’ ইত্যাদিকে কী অনায়াসে হেঁসেলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আবার ‘সায়া, কামিজ, সালোয়ার, তোয়ালে, বোতাম, ফিতেকে’ সুন্দর ভাবে বাঙালী নিজের বলে আপন করে নিয়েছে, যেমন- ‘পাঁউরুটি, সাবান, ক্রুশ (উলের), কাজু, মর্মর, আয়া, কপি (ফুল বা বাঁধা), সন্ত, বিধবা’ শব্দ গুলো নিজের করে নিয়েছে। ফলের মধ্যে, ‘আনারস, পেয়ারা, জাম্বুরা, পেপে, আতা’ শব্দ গুলোও তাদেরই, যেমন- ‘ইংরাজি, যীশু, পাদ্রি, গির্জা, খ্রিস্টান’ শব্দগুলো আসলে পর্তুগীজ শব্দ। ‘মিস্ত্রী’ থেকে ‘ইস্ত্রি’ এই দুই শব্দের মাঝে অনায়াসে ঢুকে যায় বহুলব্যবহৃত ‘ফালতু’ শব্দটাও, নেশার দ্রব্য ‘তামাক’ হোক বা ‘চুরুট’ সাবলীল অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে আমাদের বাংলাতে। ‘আলপিন’ থেকে ‘নিলাম’এর ‘রসিদ’ হোক বা বাঙালীর পছন্দের ‘কেরানি’র চাকুরি, বিপ্লবীদের ‘বোমা, কার্তুজ, গরাদ, গুদাম, ফর্মা’ শব্দগুলোও খাঁটি বাঙালী হয়ে গেছে কালক্রমে ‘আলকাতরা’ বা ‘বেহালা’র মতন।

এরপর বাংলা ছিল ইংরেজ শাসনামলের রাজধানী, সুতরাং বাংলা শব্দকোষে যে ইংরাজি শব্দেরা অতিথি হয়ে ঢুকে যাবে তাতে আর আশ্চর্যের কি রয়েছে! ‘ডাক্তার, সিনেমা, নোট, সার্টিফিকেট, সার্ফ, ফ্রি, মিল, ফ্যাক্টারি, লেভেল, ট্যাক্সি, এক্সিডেন্ট, টিফিন, মেম্বার, চেয়ার, প্রেশার, সুগার, কমপাউন্ডার, রেজিস্ট্রি, নাম্বার, আফিম, পুলিস, জেল, ফটো, ইনকোয়ারি, টিউব, স্টার্ট, গার্ড, অপারেশন, অফিস, ইস্কুল, ইস্টিশান, করগেড, কার্ড, ট্রাক্টর, টিউবওয়েল, কাপ, গেলাস, লন্ঠন, টেবিল, বাক্স, প্রাইভেট, নাইলন’ ইত্যাদির মত শত শত জনপ্রিয় শব্দগুলো সবই আসলে টেমসের পাড়ের রাণীর ভাষা, যা ভাগিরথী আর পদ্মা পাড়ের বাবুরা সমাদরে গ্রহণ করেছিল ধুতির সাথে ব্লেজার চড়িয়ে।

এছাড়া- ‘চা, চিনি, লুচি, লিচু, খান (পদবী)’ ইত্যাদি গুলো খাঁটি চীনা শব্দ। ‘রিক্সা, হারাকিরি’ ইত্যাদিরা জাপানী শব্দ, ‘লুঙ্গি’ একটি বার্মিজ শব্দ ইসলামিক নয়। ‘ইস্কাপন, রুইতন, হরতন, চিরিতন, টেক্কা, তুরুপ, ইস্ক্রু’ ইত্যাদি শব্দগুলো ওলন্দাজ জাত। ‘আঁশ, পাতি, রেস্তোরাঁ, হেঁশেল’ ইত্যাদি শব্দ গুলো শ্যেন নদী তীরের অর্থাৎ বিশুদ্ধ ফরাসি। তবে ‘হরতাল’ শব্দটা এসেছে গুজরাতি ভাষা থেকে, আর ‘বর্গি’ শব্দটা মারাঠী।

তবে হরেক দেশীয় আদিবাসী ‘দ্রাবিড়-কোল-ভিল-মুন্ডা-সাঁওতাল’ ইত্যাদি ভাষাও বাঙালী হয়েছে, যথা- ‘কুড়ি, কপাট, দাবড়া, থুতনি, ফের, তেঁতুল, প্যেনা, ঠিকানা, বোকা, ভিটে, মাদুর, কাবারি, ঢ্যেমণা, কাতলা, খাল, পেট, চুলা, কুলা, উলটপালট, গঞ্জ, চোঙ্গা, আচমকা, টোপর, ডাব, ডাগর, ঢেঁকি’ ইত্যাদি নানা শব্দকে নিজের মাঝে স্থান দিয়ে।

এই হল সংক্ষেপে বাংলায় আগন্তুক শব্দেরা।

বর্তমানে নাগপুরী গেরুয়া ভক্তের দল আরবি সংস্কৃতি বাদ দিয়ে স্বদেশী সংস্কৃতি আনতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের সুবিধার্থে এই প্রবন্ধটা কাজে আসতে পারে, যে- ঠিক কোন কোন শব্দগুলোকে বাদ দিলেই চলবে। অবশ্য এই বাদ দেওয়াদেয়ীর গপ্পো নতুন কিছু নয়, ‘বঙ্গদর্শন’ নামক একটি অন্তর্জালীয় আখারায় ‘প্রবুদ্ধ বাগচি’ মহাশয়ের একটা প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, মাননীয় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শিক্ষক ‘জয়গোপাল তর্কালঙ্কার’ (১৭৭৫-১৮৪৬) তার জীবনের এক্কেবারে শেষ লগ্নে এসে উপলব্ধি করতে পারেন যে, দীর্ঘ ইসলামিক ‘কু’শাসনে- কুলীন বাংলা ভাষায় যতেচ্ছ পরিমাণে আরবি-পারসি ভাষার ‘যবন’ অশুদ্ধি ঢুকে গেছে, যেগুলো বাংলার মর্যাদা ও মাহত্ব্যকে হানি করছে। এভাবে চললে বাংলার বুক থেকে সনাতনী হিন্দু ঐতিহ্য অচিরেই বিলুপ্ত হবে।

তো যেমন ভাবা তেমন কাজ, বাংলার শব্দকোষ ঘ্যেটে তিনি প্রভূত পরিশ্রম করে ১৮৩৮ সালে শ্রীরামপুর প্রেস থেকে প্রকাশ করলেন ‘পারশীক অভিধান’ নামের একটি বই, যেখানে আড়াই হাজারেরও বেশি আরবি-পারসি শব্দের উল্লেখ রয়েছে। ইসলামী প্রভুত্বকে বর্জন করার এক উদাত্ত আহ্বান জানিয়েই লেখা হয়েছিল এই বই এর মুখবন্ধ। তার আপন ভাষ্যে- “…ভারতের পবিত্র ভূমিতে ‘যবনসঞ্চার’ রোধ করতে হলে সর্বাগ্রে ‘যাবনিকভাষা’ পরিত্যাগ করতে হবে,… আমি বহু পরিশ্রম ব্যায়ে ক্রমে ক্রমে সংকলন করিয়া সেই বিদেশীয় ভাষার স্থলে স্বদেশীয় সাধুভাষা পূনঃস্থাপন করিবার হেতু অভিধানটি রচনা করিয়াছি। স্বকীয় ভাষার মাঝে বিদেশী ভাষা লুক্কায়িত হইয়া চিরকাল বিহার করতে পারেনা, পরকীয় বস্তুর ব্যবহারে যে লজ্জা ও গ্লানি তাহা হইতে আমাদের মুক্ত হইতে হইবে…”। 

এর ফলাফলে ‘যবনভাষ্য’ পরিত্যাগ তো দুরস্থান, বরং তৎকালীন পন্ডিত সমানে আরবি-পারসি ভাষার প্রতি সম্ভ্রম ভীষণ রকমের বেড়ে যায়, কারন এই পুস্তকের আগে একলপ্তে ঠিক এইভাবে জানার উপায় ছিলনা যে -আসলে প্রচলিত বাংলা ভাষা ঠিক কতটা আগন্তুক ভাষায় পুষ্ট। তার আবেদন কজন মেনেছিল তা আজকের ভাষাতে আরবি-ফারসিদের উপস্থিতি দেখেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়, তাছাড়া ধর্মীয় কূপমুন্ডকতার কারনে সনাতন ধর্মের লোপ পাবার আশঙ্কাটাও যে একটা স্পষ্ট বিভ্রান্তি ছিল আজ সেটাও প্রমাণিত।

সেইকালে ইংরাজি আমজনতার মাঝে ততটা জনপ্রিয়তা লাভ করেনি, তাই তাঁরা এই ‘জয়গোপাল’ পণ্ডিতের ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করার পর কি বলেছিল তা অনুমান করা খুব কষ্ট; আজকের দিনে হলে যেকোনও ভাষাবিদ, বিশুদ্ধ বাংলায় বলে উঠবেন- “ওহ সিট”

তথ্য সহায়তাঃ

  1. বাংলা দৈনিক কালের কন্ঠ
  2. বাংলা চব্বিশ
  3. শব্দগঙ্গা

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *