মোদীর ভারতে আত্মনির্ভর চীন

চীন নিয়ে চীনচিনানিটা ইদানিং বড্ড বেড়েছে, চীনা সেনা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে আমাদের ভূমি দখল করছে। অসমর্থিত সুত্র মতে লাদাখের প্যাংগং লেকের কাছে আমাদের জোয়ানদের সাথে চীনা সেনার হাতাহাতিও হয়েছে, যার একটা ভিডিও ভাইরাল হলে আমাদের সেনা মুখপাত্র সেটাকে পত্রপাঠ নাকচ করে দেন। এর পর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও NDTV এর খবর মতে সীমানে দুই দেশের সেনাই ভারী অস্ত্রসস্ত্র মজুত করছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য। চীনের এমন ব্যবহার অবশ্য নতুন কিছু নয়, লাদাখ ও অরুণাচলের অনেকটা অংশকে চীন গায়ের জোরে তাদের দেশের অংশ বলে দাবী করে।

IPL এর মাঠে চার ছয় হোক বা আউট, চিয়ারলিডারের দলের নাচুনি কখনই বন্ধ হয়না, একটা না একটা নাচিয়ে দল গানের তালে ঠিক নাচবেই, অধিকাংশ দেশজ মিডিয়া চিয়ার লিডারের মতই নেচে চলেছে সরকারের পক্ষে। এদেরকে সামলে রাখা যাদের কাজ, সেই এডিটর গিল্ডও সরকারের রক্ষিতার কাজ করছে, স্বভাবতই চীন ভারতের 60 বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে নিলেও তাদের তরফ থেকে সরকারকে কোনও প্রশ্ন করা হয়নি। লাগাতার তিন বছরে অর্থনীতি নিম্নমুখী- মিডিয়া ‘পাকিস্তান’ দেখিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে GDP ৫% ধসে গেছে, চূড়ান্ত বেকারত্ব, কর্মহীন মানুষের ভিড় বাড়ছে রোজ, পাল্লা দিয়ে ‘ক্ষুধা সূচকে’ অবনমন- মিডিয়ার কিন্তু যত প্রশ্ন সবটাই রাহুল গান্ধী আর কংগ্রেসের জন্য, সরকারের জন্য কেবলই স্তুতিকাব্য, যেমনটা গনিকারা তাদের বাবুদের জন্য করে থাকে।

নেহেরু ও নেহেরুর রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের ৬০ বছরে কি কি হয়েছে দেশে? আধুনিক ভারতের প্রতিটি নবরত্ন প্রতিষ্ঠানই তাদের আমলে তৈরি, যা দেশের গর্ব। যথা-

1. IIT

2. AIIMS

3. BSP

4. SAIL

5. BARC

6. ONGC

7. DRDO

8. IIM

9. NID

10. ISRO

11. BHEL

12. HAL ইত্যাদি

প্রসঙ্গত স্বাধীনতার যে আন্দোলন তা কংগ্রেসের নেতৃত্বেই ছিল, অতঃপর স্বাধীন ভারতে গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কৃষিতে আত্মনির্ভর হয়েছিল, শক্তি তথা বিদ্যুতে আত্মনির্ভর হয়েছিল, যানবাহনের দেশীয় কারখানা তৈরি ও সেই যানের জন্য রাস্তা তৈরি হয়েছিল। ছোট, মাঝারী ও বড় উত্পাদন শিল্পে জোয়ার এসেছিল। আইটি ইন্ড্রাষ্ট্রিতে ভারত মেধার অন্যতম বড় যোগান হিসাবে উঠে এসেছিল। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বিশ্বে সম্ভ্রম আদায় করতে পেরেছিল। মোদীর দল RSS স্বাধীনতার লড়াইতে ব্রিটিশদের পক্ষে চরবৃত্তি করত, যাতে ব্রিটিশেরা আত্মনির্ভর থাকে; স্বাভাবিকভাবেই তারা ও তাদের ভক্তদের হিসাবে ভারত আত্মনির্ভর ছিলনা কংগ্রেসী আমলে। তাদের কাছে আত্মনির্ভরতা মানে গোলামী বা দাসত্বের প্রতিশব্দ।

মোদীর আমলে ৬ বছরে আত্মনির্ভরতার কি কি হয়েছে?

গণতান্ত্রিক প্রতিটি সূচককে সবচেয়ে তলানিতে নামিয়ে এনেছে, অর্থনীতিকে শরশয্যায় পাঠিয়েছে, পায়ে হেঁটে ভ্রমণের যুগকে আবার ফেরত এনে আত্মনির্ভরতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের। সরকার হাত তুলে চৈতন্য হয়ে গেছে, পারলে নিজে নিজে বেঁচে দেখা! মানুষ বুঝতে পারছে, আত্মনির্ভরতার ভক্তিমূলক ‘মন কি বাত’ হল দাসত্ব।

নোটবন্দী, জিএসটি মানুষের রোজগার ছিনিয়ে নিয়েছে। কাশ্মীর, তিনতালাক, রামমন্দির নিয়েরোজকার ফালতু বিতর্ক দিয়ে মাতিয়ে রেখেছে জনগনকে, যাতে প্রশ্ন না করে। ক্রমাগত মবলিঞ্চিং, মুসলমান- দলিত বিদ্বেষ, ও ছোটখাটো দাঙ্গাতে গোটা দেশে হিংসা আর ঘৃণার চাষ করা হয়েছে সযত্নে। মেরুকরণ চূড়ান্ত-

মোদী জামানার এই ৬ বছরের সময়কালে অন্য কিছু দেশগুলোতে কি অগ্রগতি হয়েছে-

  • বাংলাদেশ তার গার্মেন্টস কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে যা দেশজ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে।
  • থাইল্যান্ড জাপানের ইলেকট্রনিক্স ও রাসায়নিক কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে এসেছে।
  • ভিয়েতনাম, যাদের উৎপাদন শিল্পের বৃহত্তম অংশটাই একসময় চীনে ছিল, তারা ২০২২ সালের মধ্যে ১০০% উত্পাদন নিজেদের দেশে সরিয়ে আনার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। মোবাইল টেকনোলজির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তারা গোটা বিশ্বে রপ্তানি করছে সাফল্যের সাথে।
  • ইথিওপিয়া তাদের জুতা কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে এসেছে।

এরা ভক্তদের ভাষায় ‘আত্মনির্ভর’ হয়নি।

‘দেশপ্রেমিক’ এর ভেকধারী মোদীর ভারত কি করেছে? মেক ইন ইন্ডিয়ার লোগো বানিয়েছে বিদেশ থেকে, তার বিজ্ঞাপনের দায়িত্বও পেয়েছে মার্কিন কোম্পানি। মোদীভক্তেরা দীপাবলীর সময় চীনা ‘টুনি লাইট’ বয়কট করুন ডাক দিয়ে সোশ্যালমিডিয়াতে মিম ছেরেছে, তাতে লাইক শেয়ার করেছে, আর এখন টিক-টক আনইন্সটল করছে। মোদী ও তার দল RSS জানে, যে তাদের শাসনামলে ভারত পরাধীন হয়েছে বিদেশী শক্তি ও অর্থের কাছে, তাই আত্মনির্ভরতার গল্প আনতে হচ্ছে পিঠ বাঁচাতে।

ভারতে চীনের কি ‘বিকাশ’ হয়েছে মোদীর ৬ বছরে?

ভারতের মোবাইল ফোনের বাজারের প্রায় ৭০% দখল করেছে শাওমি, ওপ্পো, ভিভো ইত্যাদি নামের চীনা কোম্পানি গুলো। লিনভো খাঁটি চীনা কোম্পানি, যা ভারতীয় ল্যাপটপের বাজারে ২৪% স্থান দখল করে আছে। ডেল মার্কিন কোম্পানি হলেও তাদের অধিকাংশ প্রডাকশন লাইন চীনে অবস্থিত, যাদের ল্যাপটপ ভারতীয় বাজার ২০% দখল করে আছে। এছাড়া আসুস ও এসার তাইওয়ানের কোম্পানি হলেও বকলমে তা চীনজাত দ্রব্যই; এদের সম্মিলিত ল্যাপটপ কম্পিউটারের বাজার ১১ %। মোদীর শাসনে ‘আচ্ছে দিন’ তো এসেছে, কিন্তু সেটা চীনের।

Directorate General of Foreign Trade | Ministry of Commerce এর তথ্য মোতাবেক ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৬১%, যেখানে ভারতের পণ্য রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৯%, এটা মোদী সরকারের একার কৃতিত্ব।

আত্মনির্ভরতার বুলি কপচানোর উপযুক্ত সময় এসেছে বটে, কারন বিকিয়ে না গেলে কীভাবে নিজেকে মুক্ত করবে? তাই প্রথম পাঁচ বছরে বিকিয়ে দিয়েছে দেশজ অর্থনীতিকে, সাইফনিক করে রাজনৈতিক তহবিলে সেই বিকানোর দালালি স্বরূপ অর্থও এসে গেছে ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ নামি পোশাকের আড়ালে; এখন ‘আত্মনির্ভর’ হওয়ার গল্প বলে দায় ঝেরে ফেলার ধান্দা।

মোদীর ‘আত্মনির্ভর’ ভারতে চীনা বিনিয়োগের একটা ক্ষুদ্র তালিকাঃ-

  • বিগ বাস্কেট- আলিবাবা গ্রুপ, TR ক্যাপিটাল
  • বাইজু’স- Téngxùn হোল্ডিং,
  • ড্রিম ইলেভেন- ফোসুন
  • ডেলিভারি কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
  • Xpress কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
  • E Cart কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
  • হাইক- CTRIP
  • ফ্লিপকার্ট- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
  • FirstCry – SoftBank Vision Fund
  • HomeShop18- Softbank Asia Infrastructure Fund
  • মেক মাই ট্রিপ- Téngxùn হোল্ডিং
  • গো আইবিবো- Téngxùn হোল্ডিং
  • রেড বাস- Téngxùn হোল্ডিং
  • উড়ান- Téngxùn হল্ডিং
  • ওলা- সিলিং ক্যাপিটাল, Steadview Capital, ইয়েল্ড ইন্টারন্যাশানাল, ECF, চাইনা ইউরেশিয়া ক্যাপিট্যাল
  • র‍্যাপিডো- ইন্ট্রিগ্রেডেড ক্যাপিটাল
  • ওয়ো- দিদি চুক্সিং, চায়না লোডিং
  • পেটিএম- আলিবাবা গ্রুপ, Softbank Asia Infrastructure Fund
  • পেটিএম মল- আলিবাবা গ্রুপ
  • পলিশি বাজার- Steadview Capital
  • কুইকার- Steadview Capital
  • রিভিগো- Softbank Asia Infrastructure Fund
  • স্ন্যাপডিল- আলিবাবা গ্রুপ, FIM মোবাইল
  • জবং- Téngxùn হোল্ডিং,
  • মিন্ত্রা- Téngxùn হোল্ডিং,
  • ক্লাব ফ্যাক্টারি- Jiayun Data Technology Co. Ltd
  • সুইগি- মেচুয়ান দেংপিং, হিলিহাউস ক্যাপিটাল, Téngxùn হোল্ডিং, সাইফ পার্টনারস
  • জোমাটো- আলিবাবা গ্রুপ, সুনেউই গ্রুও
  • নাইকা- Steadview Capital
  • ফার্মইজি- Softbank Asia Infrastructure Fund (একটা অংশ আছে)
  • মাই ড্রমেসি- সাইবার কেরিয়ার
  • জুম কার- সাইবার কেরিয়ার
  • Practo- Téngxùn হোল্ডিং
  • Gaana- Téngxùn হোল্ডিং
  • MX Player- Téngxùn হোল্ডিং
  • Khata Book- Téngxùn হোল্ডিং

মোটামুটি ভারতীয় e-commerce বা গোদাবাংলাতে অনলাইন মার্কেটের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানগুলিই চীনা পুঁজির দাসত্ব করছে। দিনের শেষে লাভের অংশটা চীনেই পৌছাচ্ছে; আর এসবের অধিকাংশের বিজ্ঞাপনী মুখ আমাদের প্রধান সেবক, চৌকিদার ‘নরেন্দ্র মোদী’ নিজে।

চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে মোদীর ঘনিষ্টতা, ছবি- গুগুল

এছাড়া ছোটখাটো অগুন্তি চীনা লগ্নি রয়েছে। ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’র বরাতও পেয়েছিল “জিয়াংসি টোকাইন মেটাল ক্র্যাফট কর্পোরেশন” নামের চীনা কোম্পানী, তারা চীন থেকে কারিগরও এনেছিল। সস্তার মাইক্রো চিপ তৈরিতে চীনের বাজার শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেই একচেটিয়া। আগামীর যে 5G প্রযুক্তি, সেখানে খোদ মার্কিনী ও ইউরোপোয়ীদের কাছেও এর কোনো বিকল্প নেই- ভারত তো সেখানে হিসাবেও আসেনা।

একজন ভক্ত যে শাওমি/ওপ্পো/ভিভো ফোন ব্যবহার করে ফ্লিপকার্ট থেকে শপিং করে, পেটিএমের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে, তারা সবাইকে চাইনিজ পণ্য বর্জন করতে বলছে। যার ডিপিতে ‘স্ট্যাটু অফ ইউনিটির’ ছবি সাঁটা। এই না হলে আচ্ছে দিন! মানুষ আর ভক্তের তো এখানেই ফারাক।

সোনাম ওয়াংচুকের মত দু’একটা ছুপা ভক্ত চীনা পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় পদপ্রাপ্তির নেশা জন্মেছে মনে, আরেকটু আত্মনির্ভর হতে যেটা ভীষণ জরুরী। চীনা পণ্য বর্জন তো করব, কিন্তু আমরা তো আর চীনে গিয়ে কেনাকাটা করিনা। ওয়াংচুক সাহেব সবাইকে নিজের মত ছাগল ভেবে নিয়েছেন, যে- ‘যা বলব তাই লোকে খাবে’, সকলে যে ভক্ত নয় সেটা ওনারা ভুলে গেছেন। উনার যদি সত্যি সদিচ্ছা থাকত, তাহলে কেন্দ্রের সরকারকে বলুক চীনা পণ্যের আমদানি বন্ধ করতে, ব্যাস হয়ে গেল। ময়ুরপুচ্ছধারী কাকেরা ততক্ষণ পর্যন্ত সুন্দর, যতক্ষননা ডেকে উঠছে, ওয়াংচুক সাহেব সেই তালিকাতে নব্য সংযোজন মাত্র।

ভারতের জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট, যে দলের মূল স্পনসর ওপ্পো। ভক্তরা নিশ্চই ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যান করবে আগামী ৪ বছর- 

‘মোদী হ্যাঁয় তো মুমকিন হ্যাঁয়’

তথ্য সহায়তায়ঃ

https://www.investindia. gov.in/country/china

2 comments on “মোদীর ভারতে আত্মনির্ভর চীন”

  1. প্রীতম সী Reply

    উফ্,,, এতো তথ্য !!

    what a comparison between 60 years and 6 years..

    পড়ে জাস্ট মন ভরে গেলো।
    ওয়াংচুক সম্বন্ধে আমারও ধারণা তাই। প্রযুক্তির এতো উন্নতি ঘটিয়েও শিরোনাম দখল করতে পারেননি কখনও। তাই এটাই সেরা সময়।

    আর চীনা দ্রব্য বর্জন কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই আর সম্ভব নয়। যদি সম্ভব হয়েও থাকে তবে তা হাজার বছর পরের কথা।

    এই আর্টিকেলটার ইংরেজি ভার্সন যদি কোনো বড়ো সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়, তাহলে টীম মোদীর রাতের ঘুম উড়ে যাবে এক লহমায়। দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগিয়ে আপনাকে জেলে ভরে দিলেও খুব বেশি আশ্চর্য হবো না আমি।

    ভালো থাকুন আর এরকম তথ্যপূর্ণ লেখা আমাদের উপহার দিতে থাকুন।।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *