মানুষ।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব ও বুদ্ধিমান। প্রতিটি মানুষের নিজের মত করে একটা জীবন সৌন্দর্য থাকে, যেটা মূলত চেতনা, বিবেক, সংবেদনশীলতা, আর আবেগ দিয়ে পুষ্ট। জীবন শুরু হয় অতি অরক্ষিত ও অসহায় অবস্থার মধ্যদিয়ে। সেই পরিস্থিতি থেকে প্রতিনিয়ত জৈবিক বৃদ্ধির সাথে সাথে জ্ঞানার্জনও চলতে থাকে সমান গতিতে। ধীরে ধীরে যার মধ্যে মানবিক ও পাশবিক দুটো ধারাই বিকাশ লাভ করে। যাদের মধ্যে মানবিক গুনের মাত্রা সর্বচ্চো ও সর্বোৎকৃষ্ট মানের থাকে তিনি উচ্চ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠেন, দ্বিতীয়টা ঘটলে সেক্ষেত্রে তিনি ঘৃণিত ব্যাক্তি হিসাবে স্বীকৃত হন। যেকোন কিছু অর্জন করার জন্য একটি ভিত্তির প্রয়োজন , আর সেই ভিত্তিটির নাম হল বিশ্বাস।

সন্ত ব্যাতিত সকল মানবের জীবন ষড় রিপু দিয়েই ঘেরা। আর এই রিপুর ক্ষুন্নিবৃত্তি শুরুই হয় একটা আশাকে কেন্দ্র করে। প্রশ্ন উঠবে এই আশার উৎস কি? উৎস হল বিশ্বাস। বিশ্বাস হল একটা ভাবনাগত অবস্থান। যেটা সম্পূর্ন মস্তিষ্ক দ্বারা পরিচালিত ও হৃদয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মানসিক স্থিতির দুর্দম ও আচ্ছন্নকারি দশা। যেখানে সেই মানসিক দশা, যাবতীয় পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলী তথা সময় ও জীবনের সমান্তরাল গতি সমূহের সত্য বা মিথ্যাকে প্রতিনিয়ত বিচার বিশ্লেষণ করতে দেয়না, তাকেই বিশ্বাস বলে। মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে যে মানসিক সংগঠন তৈরি করে, সেখানে বিভিন্ন ব্যাক্তিত্ব বর্গ, পুঁথিগত জ্ঞান, পরিক্ষালব্ধ জ্ঞান, ব্যাবহারিক জ্ঞান, গবেষণা অর্জিত জ্ঞান, অপরের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ, পরিস্থিতি ভেদে তাৎক্ষণিক আচরনের বহিঃপ্রকাশের উপরে ভিত্তি করে নিজেকে তৈরি করে। যেটা একটা পৃথক মৌলিক স্বত্তা। এই মৌলিক স্বত্তাকে যাহা সন্তুষ্টি প্রদান করে তাকেও বিশ্বাস বলে।

বিশ্বাসের আবাসস্থল মানুষের মন, তাহলে একবার দেখে নেওয়া যাক মনের কার্যপদ্ধতি।   মানুষের মনের দুটো দশা, একটা সচেতন দশা আর দ্বিতীয়টা অবচেতন দশা। আমরা যাকিছু দেখি বা শুনি সেগুলো সচেতন মনে, আর সেগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ধূসর স্মৃতিপাত্রে সঞ্চিত ও সংরক্ষিত হতে থাকে। সেই স্মৃতিপাত্রের ক্ষমতা থাকেনা সেগুলির সত্যমিথ্যা যাচায়ের। যে অভ্যাসের স্মৃতিগুলো বারংবার করে সঞ্চিত হতে থাকে, আমাদের অবচেতন মনে সেগুলোর একটা স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়। তখন কোন দ্বিতীয় ভাবনাকে সচেতন মন উপস্থাপন করলেও , অবচেতন মন তাকে প্রত্যাখ্যান করে সযত্নে। কারন বারংবার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলা ঘটনাকেই আমাদের অবচেতন মন সত্য বলে ধরে নেয়, এবং তার ভিত্তিতেই একটা আদর্শ তৈরি করে। মানব চরিত্রের যাবতীয় অভ্যাসগুলো আসলে পরিচালিত হয় অবচেতন মনের নেতৃত্বে।  যেমন যেকোন নেশা, যথা তামাকসেবন বা মদ্যপান বারংবার করে অভ্যাসিত হয়ে চললে আমাদের অবচেতন মনে তার একটি প্রতিভূ তৈরি হয়, এবং সেটাকেই সত্য বলে মেনে নেয়। এমতাবস্থাতে ওই সত্যকে, সচেতন মনের অর্জিত নতুন কোন সত্য, বা সেই পূর্ব সত্যের মিথ্যাচার সম্বন্ধীয় যাবতীয় সতর্কবার্তাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। এটাই আসলে বিশ্বাস। অতএব আমাদের চরিত্রের অভ্যাস নির্মিত হয় আমাদের অবচেতন মনের নিয়ন্ত্রণে। অনুশীলন তথা পুনরাবৃত্তিই আমাদের চরিত্র গঠন করে।    

বিশ্বাসের জন্মদাতা সচেতন মন, কিন্তু বাসস্থান অবচেতন মনে। বিচিত্র কল্পনা, দর্শন আর দীর্ঘসময় যাবৎ সেই বিশ্বাসকে অবচেতন মনের জমিতে কর্ষন করে লালন পালন করতে করতে একসময় সেই জন্মদাতা সচেতন স্বত্তাকেও গ্রাস করে, এবং সম্পূর্ন জীবনের দখল নিয়ে নেয় সেই বিশ্বাস। আত্মহত্যা আসলেই এই ঘটনারই কার্যকরী রূপ। কোন একটি পরিস্থিতিকে আমরা যখন আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও মেধার পরিস্ফুটন দ্বারা বিশ্লেষনে অক্ষম হই বা বিশ্লেষনে মানসিক ভাবে কোন শক্তি দ্বারা বাধা প্রাপ্ত হই তাকেও বিশ্বাস বলে। ঈশ্বরবাদের ধারনার শুরুও সম্ভবত এই পরিসর থেকেই। মানুষ শিশুকাল থেকে সে সমাজে বড় হয়, যেখানে জ্ঞানলাভ করে, যাকিছু চোখে দেখে, কানে শোনে, সেটাই মননে প্রতিফলিত হয়ে একটা ভাবমূলক বিমূর্ত ধারনার জন্ম দেয়, তাকেও বিশ্বাস বলে। এই বিশ্বাস গড়ে উঠতে অনেকটা সময় নেয়, কিন্তু এক লপ্তেই সেটা অবলুপ্ত হওয়ার ক্ষমতা রাখে।

আমরা মানুষ স্বনির্ভর নই। দুএকটি ক্ষেত্র ব্যাতিত প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আমরা কারো না কারোর উপরে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা থেকেই আমাদের মধ্যে বাকিদের সাথে একটা আদানপ্রদানের সম্পর্কসূত্র তৈরি হয়। দীর্ঘস্থায়ী এই লেনদেন ভরসা র স্থান তৈরি করে। মানুষের চাহিদা আর তার বাস্তবায়ন যদি সেই ভরসা স্থলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে তখন সেই ব্যাক্তি, বস্তু, বা আদর্শকে মানুষ ধ্রুবক হিসাবে মেনে নেয়। তখন সেই ধ্রুবককে ঘিরে স্বতঃস্ফুর্ততাকে মানুষের বিশ্বাস বলে অবহিত করি। সচেতন মনন যে কোন পরিস্থিতিকে সকল সময় পুঙ্খানুপুঙ্খ যুক্তি দিয়ে বিচার করে, ব্যাক্তি, বস্তু বা আদর্শকে। এখানকার লেনদেনে অর্ধাঅর্ধি লাভক্ষতির সম্ভাবনা সেটা সকলেই মানি ও জানি। কিন্তু অবচেতন মনের কোটরে লালিত বিশ্বাস যদি কোথাও সামান্যতমও পরাভূত  বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সেখান থেকেই হতাশার সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে প্রথম ফাটলটা দেখা যায় আত্মবিশ্বাসে।

যেকোন বিশ্বাসের মূলটা শুরু হয় সৃজনশীল ও কল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে, নিজস্বার্থে ও পরার্থে। মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাসকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সুদৃঢ়ভাবে মূল্যবোধ রূপে উপস্থিত করে থাকে। মূল্যবোধ এমনই একটি গুণ, যার দ্বারা সমাজের বুকে ব্যাক্তি তার স্বকীয়তার ছাপ রেখে যেতে সক্ষম। নিজের অতুল্য বৈশিষ্ঠ্য প্রতিষ্ঠা দান ও বাকিদের থেকে স্বতন্ত্রতা রক্ষিত করে এই মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধের কাঠামোটাই তৈরিহয় ব্যাক্তির দর্শনের উপরে ভিত্তি করে, আর দর্শনের ভিত্তি সেই বিশ্বাস ও তার সার্থক বাস্তব প্রতিফলন। প্রতিটি মানুষ তার বিশ্বাসকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করতে ভালবাসে, বা সেই বিশ্বাস দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করে থাকে। সেই বিশ্বাসবাদের সার্থক প্রতিফলনে যদি বৃহত্তর সমাজের প্রতিচ্ছবি প্রতিভাত না হয়, তখন সেই বিশ্বাসের উপরে অভিঘাত এসে পরে। অবচেতন মন সত্যমিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ করতে অক্ষম। যার জন্য জীবনের কোন একটি সময়কালে গৃহীত বিশ্বাস , একটি নির্দিষ্ট সময়ের পথ অতিক্রান্তে সেটাকে বড্ড জোলো মনে হলেও অবচেতন মন সেটাকে অগ্রাহ্য করে পূর্বতন ধারনাকেই মান্যতা দিয়ে থাকে, এই ধরনের বিশ্বাসকেই বলা হয় খেয়ালি বা উদ্ভট কল্পনা।

মহামানবেরা তাদের জীবন দর্শন দিয়ে সমাজের বুকে নানান ধরনের পৃথক পৃথক বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে গেছেন। যেগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্ম, বিজ্ঞান, রাষ্ট্র, পরিবার ইত্যাদি ছোট থেকে বড় নানান ধরনের গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশ্বাস ঘরানা গুলোর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান ঘিরেও চলে নিরন্তর প্রতিযোগিতা। ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য মানবের নিজের ক্ষমতা, জ্ঞান, প্রভাব ও বিচক্ষনতার উপরে বিশ্বাস রাখতে হয়, এই বিশ্বাসকে আত্মবিশ্বাস বলা হয়। আবার এই আত্মবিশ্বাস যখন সচেতন মনের অনুভূতিকে উপেক্ষা করে, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়, সেটাকেই অহংকার বলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে অবশেষে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে প্রকট হতে হয়। তিনিই সমাজের প্রভাবশালী ব্যাক্তি, যিনি নিজের মধ্যে থাকা বিশ্বাসকে জনসমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। 

বিশ্বাস আঘাতপ্রাপ্ত, আজকের সমাজে এটা একটা বহুলপ্রচলিত শব্দ। দেখা যাক এটি কিভাবে সম্পাদিত হয়। অবচেতন মন প্রায় সর্বদা ব্যাক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই অবচেতন মনের শক্তির কেন্দ্রস্থল হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের স্মরণ কোষিকাগুচ্ছ। এরা সেই স্মৃতিশক্তি, যারা শুধুই সংরক্ষিত হয়, যাদের কোন অতীত নেই, বর্তমান নেই, ভবিষ্যতও নেই। শুধু ফিকে হয়ে যাবার ক্ষমতা রয়েছে। আর বিশ্বাসের ও দর্শনের বাস ওই স্মৃতিকোষের আস্তরনে ও পরতে পরতে।  আমরা যা কিছু দেখছি যা কিছু শুনছি, সচেতন মনের আরশিতে সকল কিছুই সেটা প্রতিফলিত হয়ে চলে। সচেতন মন সময়ের সারণির সাওয়ারি। যার জন্য প্রতিমূহুর্তেই দৃশ্য, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বদলে চলে, এখানে বিরাম বলে কিছু নেই। কিন্তু অবচেতন মনের কোন কাল জ্ঞান নেই, আর রয়েছে ভাবনার জন্য অফুরন্ত সময়। সকালের কোন ঘটনা তাৎক্ষণিক ভুলে গেলেও, দেখা যায় রাত্রিতে শুয়ে মনে মনে সেটারই বিচার বিশ্লেষণ করে চলেছি। আমাদের অন্তরের বিশ্বাসের ছাকনিতে যাকে চুলচেরা বিচার করে থাকি। যেখানে একটা মানসিক টানাপোড়েনের পরিস্থতির উদ্ভব হয়, যাকে মানসিক পীড়ন বা টেনসন বলে। এই পীড়ন যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন সেই নব্য চিন্তাধারাকে মেনে নিতে না পারার দরুন ও নিজেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ না খাওয়াতে পেরে, অন্যের কাছে বা নিজের কাছেই পরাজিত বোধ হয়। এটাকেই বিশ্বাসের ঘরে আঘাত বলে ধরা হয়। হিংসা, ক্রোধ, বৈরিতা ও সংহার প্রবৃত্তির বোধ মননে জাগ্রত হয় ও চরিত্রে ফুটে উঠে।

বিশ্বাস বদল হয়। কারন ওই আগেই বলা হয়েছে, অবচেতন মনের গহিনে কোন কালজ্ঞান নেই। অবচেতন মনের কোন ক্ষমতা নেই কোন প্রকারের প্রভাবকে শনাক্ত করা। যে ঘটনাটা এই মুহুর্তে আপনার মনের ভিতরে আপনাকে ব্যাস্ত রেখেছে, সেটাই আপনার অবচেতন মনের কাছে একমাত্র বাস্তব। সচেতন মনের দৃষ্টিতে আজকে কোন একটা দর্শন, আপনার জ্ঞানের ঘরে বাতি প্রজ্বলিত করে দিল, দেখা গেল তার সাথে অনেক পুরাতন ঘটনা স্মৃতিপটে নতুন করে ভেসে উঠল। যেমন শৈশবের অশরীরি অস্তিত্ব যতটা ভয় প্রদান করত, মধ্য বয়েসের কোন বিশেষ ঘটনাতে তার স্বরূপ উন্মোচন করলে সেই পুরাতন শিশুশুলভ বিশ্বাসের কথা স্মৃতিতে জেগে উঠে, ও স্বনিয়মেই বিশ্বাসের পরিমার্জন ও পরিবর্ধন ঘটে যায়। মানুষ ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখে সেটাও এই অবচেতন মনেরই কারসাজি। যে বিশ্বাসের প্রকোপে ব্যাক্তি বিভোর বা আতঙ্কগ্রস্থ, সাধারনত সেই ধরনের স্বপ্নই মানুষ দেখে থাকে। মজার বিষয় হল , যে বিশ্বাসের দরুন স্বপ্ন দেখা, সেই স্বপ্নকেই আবার বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয়। যার জন্য  বিশ্বাসের কোন অন্ত নেই। সচেতন মন যুক্তি নির্ভর, হ্যাঁ বা না এ উত্তর দিয়ে দেয়, এবং ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু অবচেতন মনে সঞ্চিত বিশ্বাসের সাথে যুক্তির সমানে দ্বন্দ্ব চলে কারন তার ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। বলাই বাহুল্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্বাস বিজয়ী হয় মনের ঘরে। 

আবার ফেরা যাক সেই রিপুতে। বিচার ক্ষমতার গুণে সচেতন মন জানে নিজের এক্তিয়ার কতটা আর কতটা তার প্রাপ্য। কিন্তু অবচেতন মনের লালিত বিশ্বাস সেটাকে স্বীকার করতেই চাইনা। একটা সংঘাতের স্থান তৈরি হয়। আর যারা এই সংঘাত এড়াতে চান, তারা ওই বিশ্বাসকে একটা নতুন মোড়কে নিজের কাছে পরিবেশন করেন, যাকে অন্ধবিশ্বাস বলা হয়। যে বিশ্বাস কোন তথ্য মানেনা, যুক্তির আশপাশ দিয়ে হাটেনা, বিশ্লেষণ থেকে শতহস্ত দূরে অবস্থান করে, সেই বিশ্বাসই নিশ্চিত রূপে অন্ধবিশ্বাস। আর অন্ধবিশ্বাসে ভর করে যে সংস্কার ও সংস্কৃতি জন্মলাভ করে, তাদের যথাক্রমে কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতি নামেই আমরা চিনি। আমাদের সমাজে বহু কিছুর অভাব থাকতেই পারে, কারন এটা সত্য। তবে যেটার অভাব নেই সেটার নাম হল অন্ধবিশ্বাস। কিছু বিশ্বাস যতই ঠুনকো হোকনা কেন, যদি তাতে স্বার্থের আতর মেশানো থাকে, সেখানে তাঁকে নিদেনপক্ষে ঐতিহ্যের নাম দিয়েও বিশ্বাসকে জীবন্ত করে রাখা হয়।

যৌনতা, সংখ্যাগুরু ও লঘু, নাগরিকত্বের বৈধ ও অবৈধতা, কর্ম ও বয়েসের কল্পিত সীমারেখা, সামাজিক প্রভেদ সহ নারী পুরুষের অধিকারের চিরাচরিত ধারণা  প্রভূত বিষয়ে আমাদের যুক্তির থেকে আবহমান কাল ধরে চলে আসা বিশ্বাসই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তবেই না অধিকার নিয়ে এতো আন্দোলন। তাহলে এই সমস্যার মূলেও সেই বিশ্বাস। জীবন যৌবন, দেশ কাল, জাতি ধর্ম, শিল্প কৃষ্টি, সহ প্রতিটি মুহুর্তেই অধিবিশ্বাসে বা অন্ধবিশ্বাসের বাড়বাড়ন্ত। একমাত্র উন্মাদ ব্যাতিত সকল সুস্থ মানুষই সচেতন মনের অধিকারী। সচেতন মন থাকা মানেই দেখা, শোনা, পড়া। যথারীতি এগুলো মস্তিষ্কে সংরক্ষিত হতেই থাকে ক্রমান্বয়ে। অনুশীলিত কর্মকান্ডগুলোর প্রভাবে নতুন নতুন বিশ্বাস জন্মনেয়, পুরাতন কিছু বিশ্বাস খন্ডিত হয় যুক্তির কাছে। কিছু মানুষ বলে থাকেন, তিনি কোন কিছুই বিশ্বাস করেননা। এটাও আসলে সত্যের অপলাপ। হতেই পারে কেও ঝাড়ফুঁক , তাবিজ, কবচ, রত্নপাথর, মন্ত্রপূত সুতো বা জল তেলে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তাতে তার কাঙ্খিত স্বার্থ চরতার্থ না ঘটতেই তিনি নাস্তিক হয়ে গেলেন। আসলে কিন্তু তার ঈশ্বর বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটে ঈশ্বর নেই বিশ্বাসের সূচনা হল। আগে সকল কিছুতেই তিনি ঈশ্বর দেখতেন, এখন প্রমান করতে ব্যাস্ত যে কোথাও ঈশ্বর নেই। বস্তত বিশ্বাসের কোন পরিবর্তন ঘটলনা, শুধু বিশ্বাসের দিক পরিবর্তন ঘটল মাত্র। সমাজসংস্কারকগণ যুগে যুগে আবির্ভূত  হন দশক দশক ধরে চলে আসা ক্ষয়িষ্ণু মুল্যোবোধ যুক্ত বিশ্বাসগুলোকে পূনর্মুল্যায়ন করতে। আধুনিক সমাজের উন্মেষের যুক্তিতে আলোকিত করে সমাজের বুকে চেপে বসা জগদ্দল পাথর সরিয়ে, মুক্ত বাতাস আনয়ন করেন। যেখানে বিষ-শ্বাসের অবলুপ্তি ঘটিয়ে বিশ্বাসের পরিমার্জন ঘটে।

© উন্মাদ হার্মাদ​

স্বজাতীয় রচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *