“আয়রে ভোলা খেয়াল-খোলা

স্বপনদোলা নাচিয়ে আয়,

আয়রে পাগল আবোল তাবোল

মত্ত মাদল বাজিয়ে আয়।…

আয় বেয়াড়া সৃষ্টিছাড়া

নিয়মহারা হিসাবহীন।

আজগুবি চাল বেঠিক বেতাল

মাতবি মাতাল রঙ্গেতে—

আয়রে তবে ভুলের ভবে

অসম্ভবের ছন্দেতে”॥

এটা শিশুদের জন্য লেখা একটা আজগুবি ছড়া। ছেলে মানুষদের জন্য পাঠ্য হলেও এই সাহিত্যের রচনা করাটা মোটেই ছেলেখেলা নয়, চলুন কিছুটা অকপট আলোকপাত করা যাক এই বিষয়ে।

নিরন্তর শিক্ষালাভের মাধ্যমেই প্রানীর জৈবিক ও মৌলিক স্বত্তাগুলো সময়ের সাথে সাথে ক্রম বিকশিত হতে থাকে। এই শিক্ষা ব্যবস্থাটা শুরু হয় এক্কেবারে শিশু অবস্থাথেকে। প্রথমে মা, তারপর ধীরে ধীরে পরিবারের অন্যান্য সদস্য, এরপরে প্রকৃতি ও সমাজ আমাদের দেখিয়ে ও ঠেকিয়ে শিখিয়ে দেয়। তার পরেও এই বিশালাকায় ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই প্রায় কিছুই জানা বাকি থেকে যায়, সেই শূন্যস্থান পূরন করতে পারে একমাত্র কেতাবি শিক্ষা।

কেতাবি শিক্ষার শুরুটা আমাদের দেশে সাধারনত পরিবারের কোনো সদস্যের কাছে বা গৃহশিক্ষকের দ্বারাই সূচিত হয়। পরবর্তীতে যার আনুষ্ঠানিক ধারা নিন্ম বুনিয়াদী বিদ্যালয়ের দুয়ার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে।  আক্ষরিক ও বাস্তবিক অর্থে এই শিক্ষা ব্যাবস্থা একটি সময়ের পরে শিশুদের কাছে অত্যন্ত ক্লান্তিকর একঘেয়ে মনে হয়। তারই সমাধান হিসাবে প্রণয়ন হয়েছিল শিশু কিশোর সাহিত্যের । একটা প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কের সাথে একটা শিশুমনের কাব্যিক মিলান্তিই শিশু কিশোর সাহিত্যের জন্ম দিয়ে থাকে।  সাহিত্য, বিজ্ঞান, গনিত, ভূগোল, সাধারণ জ্ঞান কখনই এতোটা মজাদার হতনা যদিনা কিছু মহিমান্বিত মানুষ শিশু-কিশোর মনের মনস্তত্ব অনুযায়ী বিবেচনা করে বিভিন্ন মজাদার ও আকর্ষনীয় আঙ্গিকে, শ্রুতিমধুর ছন্দে আশ্চর্য সকল সম্ভার রচনা করতেন।

এটাই শিশু কিশোর সাহিত্য।

শিশু কিশোর সাহিত্য কথাটিতে দুটো শব্দের সমাহারে গঠিত। যেখানে কোনো একটির ঘাটতি ঘটলে সেটাকে আর শিশু কিশোর সাহিত্য বলা যায়না। সাহিত্যের শুরুতে শিশু শব্দটা থাকলেও মোটেই এটাতে সাহিত্যগুন কম থাকলে চলেনা। নানান ধরনের কল্পনাকে শিশু কিশোর মনের মাধুরীর সাথে মিশিয়ে, শিশু মনের উপযোগী শব্দ, বর্ন, ভাষা বিন্যাস, ইত্যাদিগুলো সরল ও সহজ ভাষাতে গল্প, ছড়া, নীতিকথা, রূপকথার গল্প আকারে প্রকাশ করাটা মোটেই শিশুসুলভ কাজ নয়। শিশু মনের সদা জিজ্ঞাস্য মনোভাব ও অপার খেয়ালী শক্তির মিশেলর সাথে খাপ খাইয়ে, সাহিত্যকে  বিশেষ কৌশলে তাদের মনের মত বুনে শিশু ও কিশোরদের উপযোগী করে তোলাটা অন্যতম দূঢ়হ কর্মের একটি। যার জন্যই আজকের আধুনিক যুগে ঠিক সেই দড়ের শিশু সাহিত্যিকের দেখা মেলেনা। শিশু কিশোর সাহিত্যের সকল কিছুই, যেমন রচনা, সম্পাদনা, পুস্তক হিসাবে চয়ন ও অধ্যয়ন করানো সবটাই প্রাপ্তবয়স্কেরা করে থাকেন, তাই এই সাহিত্যে বড়দের জন্যও পাঠ্যসুখ থাকাটা অতি আবশ্যক, নতুবা তারাও আকর্ষন হারাবে। শিশু কিশোর সাহিত্যের অমোঘ টানের রেসটা গোটা জীবন জুড়েই বহমান থেকে বড়দেরও।

  বাংলা ভাষার নিরিখে ১৮টি গল্প সমৃদ্ধ ‘নীতিকথামালা’ বইটিই প্রথম শিশু কিশোর সাহিত্য হিসাবে স্বীকৃত। কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটি কতৃক যেটা তৎকালীন ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও পৃথিবীর ইতিহাসে ১৬৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ লেখক জন কটন সাহেবের ‘ স্পিরিচুয়াল বুক ফর বস্টন বেবিস’ বইটিকেই শিশুদের জন্য সর্বপ্রথম বই হিসাবে গন্য করা হয়ে থাকে। এর আগে শিশুদের জন্য ‘আলাদা’ করে তেমন ভাবনা গুলোর কোনো লিখিত বা ছাপার অক্ষরে ইতিহাস নেই। যদিও অন্য একটা অসমর্থিত সুত্রের মতে ১৫৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ডেনিস লেখক নিলস ব্রিদালের লেখা ‘দ্যা চিলড্রেনস মিরর’ বইটির কথাও প্রথম হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এর পরের ইতিহাস ধীরে ধীরে সমৃদ্ধশালী হয়ে থাকে। ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইতালি, সুইডেন, নেদারল্যান্ড সহ আমেরিকা ও প্রভূত ইউরোপীয় দেশগুলোতে ‘শিশু কিশোর সাহিত্য’ বিকাশের প্রামান্য উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে রূপকথার গল্পকে পূর্নাঙ্গ শিশু কিশোর সাহিত্য ধরলে অবশ্যই ইতালীয় লেখক জিওভান্নি ফ্রান্সিস্কো স্ত্রাপারোলা রচিত ‘দ্য ফেস্টিয়াস নাইটস অফ স্ত্রাপাতোলা’ নামক পুস্তকটি প্রথম হওয়ার মুকুটটি ধারণ করবে। যেটা ১৫৫০ খ্রীষ্টাব্দের প্রকাশিত হয়েছিল, তবে এতে প্রাপ্তবয়স্কদের মানের প্রচুর বিষয় থাকায় অনেকে একে শিশু কিশোর সাহিত্য বলতে নারাজ।

এতো গেল সাবেক তথা শুরুর কথা। সময়ের চাহিদা মেনে শিশু কিশোর সাহিত্য, অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে সাহিত্যচর্চার একটা সম্পূর্ন ধারা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্টা করেছে। যেখানে শিশু কিশোর সাহিত্য শুধুমাত্র শিশুদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, প্রমান হিসাবে ব্রিটিশ লেখিকা জে কে রাউলিং এর হ্যারি পটার সিরিজের কথা বলা যেতেই পারে। আধুনিক প্রযুক্তির সবাক চলচ্চিত্রের যুগে শিশু কিশোর সাহিত্যটাই মোড়ক বদলে, এক নতুন আঙ্গিকে নীতিকথা ও জ্ঞানযুক্ত মনোরঞ্জনের মাধ্যম- কার্টুন হিসাবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে।

আজকের দিনে প্রায় গোটা পৃথিবী জুড়ে, কেতাবী শিক্ষা ব্যবস্থাতে ‘প্লে স্কুল’ এর পর থেকেই শিশু পাঠ্যবই অনুশীলন শুরু হয়ে যায়। অক্ষর শিক্ষা ও সংখ্যা চেনার পর ধাপে ধাপে শুরু হয় শ্রেনী অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, শিশু সাহিত্য যার মধ্যে একটা বিশাল অংশ জুড়ে থাকে। গোটা পৃথিবী জুড়ে যে কয় ধরনের শিশু কিশোর সাহিত্য আছে তাদেরকে মোটামুটি ৫ ভাবে শ্রেনিবিভাগ করা যায়-

১) শুধুমাত্র হাস্যরসের নিমিত্ত একধরনের কাল্পনিক চরিত্র গঠন ও উদ্ভট রচনা। যা প্রানখুলে হাসতে সাহায্য করে, এবং ক্ষনিকের জন্য হলেও মানসিক চাপ মুক্তকরে।

২) বিভিন্ন লোককথা, পুরাণ, জাতকের গল্প,  ধর্মকথা ইত্যাদি অপ্রমানযোগ্য অতীতকে গৌরবময় করে গল্পচ্ছলে প্রায় সত্যের কাছাকাছির মতন করে বলা ও উপংহার স্বরূপ নীতিকথা দিয়ে সমাপ্ত করা। এতে করে শুভচিন্তার বিকাশ হয় ও মূল্যবোধ বস্তুটি তৈরি হয়।

৩) সম্পূর্ন ক্ষণস্থায়ী ও বানিজ্যিক কারনে তৈরি আমুদে কৌতুক জাতীয় পুস্তক। এই বই গুলো শিশুর প্রাথমিক সামাজিক চরিত্র গঠনে এক বিশেষ ভূমিকা নেয়, যেমন বিভিন্ন ধরনের কমিকস এর বই।

৪) ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্রগুলোকে একত্রে সঙ্কলন করে এবং শিশুমনে চাপ সৃষ্টিকারী বিষয়কে নিষ্কাশন করে ছাপার অক্ষরে এগুলো প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন মহাপুরুষের জীবনীও এর অন্তর্ভুক্ত। এর থেকে ইতিহাসকে যেমন গল্পের ছলে জানা যায়, ঠিক তেমনই শৈর্য, বীর্য ও সাহসের বিষয়ে শিশুরা অভিজ্ঞান প্রাপ্ত হয়।

৫) নানান ধরনের দৈনিক সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা, নানা স্থানের বর্ননা সহ, নানান ধরনের পেশা, নেশা, মানব চরিত্র ইত্যাদির সংগঠিত সম্মিলনী ঘটিয়ে কাল্পনিক ঘটনাক্রম দিয়ে সাজানো সরল সাহিত্য। যেমন বিভিন্ন ধরনের গোয়ান্দা কাহিনী, অভিযান সমগ্র, অমনিবাস ইত্যাদি। চিন্তাশক্তিকে পুষ্টি দেয় এই ধরনের সাহিত্য।

বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এখানে মূলত তিনটি ধারা বহমান। একটি রবীন্দ্র পূর্ববর্তী সাহিত্য ঘরানা, দ্বিতীয়টি রবীন্দ্র ও রবীন্দ্র পরবর্তী অধ্যয়। তৃতীয়টি এক এবং অদ্বিতীয় সুকুমার রায় ও তাঁর পরিবার।

রবীন্দ্র পূর্ববর্তী যুগের উল্লেখযোগ্য নামগুলি হল অক্ষয়কুমার দত্ত, বিদ্যাসুন্দরী দেবী, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখের সাথে স্বয়ং মাননীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়। যার প্রণীত বর্ণপরিচয় দিয়ে অক্ষরজ্ঞান শুরু করে, বোধোদয়, কথামালা, আখ্যানমঞ্জরী, চরিতাবলী ইত্যাদি শুধু শিশু কিশোর সাহিত্য নয়, গোটা বাংলা ভাষা সাহিত্যের এক অনন্য মাইল ফলক।

পরবর্তীতে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই যখন একটা গোটা প্রতিষ্ঠান, সুতরাং সেই প্রতিষ্ঠানের সদর দুয়ারে আলো করে বিরাজ করছে সহজ পাঠ। সহজ পাঠের সহজিয়া ভাষা যেকোনো বাঙালির কাছে অহংকার স্বরূপ, যা জীবনের বার্ধক্যে পৌঁছেও এতটুকু আকর্ষন ম্লান করেনা। তাঁর কাব্যগ্রন্থ শিশু’র ছত্রে ছত্রে শৈশবের রঙ ছরানো। কবিগুরুকে শিয়রে রেখে একটু এগিয়ে গেলেই এই সময়েই যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হাসিখুশি, কাজী নজরুল ইসলামের ঝিঙেফুল, দক্ষিনারঞ্জনের ঠাকুমার ঝুলি, অবন ঠাকুর, বিভূতিভূষণ, নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমল ঘোষ মৌমাছি সহ, জসিমুদ্দিন, বন্দে আলী মিঞা, আরো পরে নারায়ন সান্যাল, নারায়ন দেবনাথ প্রমুখ বাংলা শিশু কিশোর সাহিত্যের  ধ্বজাকে উতকর্ষের শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন।

তৃতীয় পরিভাগে একমদ্বিতীয় সুকুমার রায় ও তাঁর পরিবার। যে পরিবারটির অবদান গোটা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য নজির সৃষ্টিকারী। তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোরও থেকে শুরু, তাঁর রচিত টুনটুনি ও বিড়াল, মজন্তালী সরকার, গুপি বাঘার গল্প, ছোটদের রামায়ণের আজও কোনো বিকল্প নেই। সন্দেশ নামক শিশু কিশোর সাহিত্য পত্রিকাটিও তাঁরই সৃষ্টি। সুকুমার পুত্র সত্যজিৎ রায় এমনই কীর্তিমান যে, তাকে তথাকথিত উন্নত বিশ্বও কুর্নিশ জানাতে ভোলেনি। তাঁর সৃষ্ট ফেলুদা-লালমোহন জুটি হোক বা প্রফেসর শঙ্কু কিম্বা ডাঃ মুনসির ডায়েরি, বিশ্ব শিশু কিশোর সাহিত্য মানিচিত্রে এক যুগান্তকারী অবদান।

পরিশেষে সুকুমার রায় খোদ, মানুষটি যদি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে অকালে পরলোক গমন না করতেন তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দি সম্ভবত থাকতনা এই পৃথিবীতে। ‘ননসেন্স রাইম’ নামক ইংরেজি শব্দটির একমাত্র বাংলা রূপাকার। অনবিল হাস্যরসে সমৃদ্ধ প্রতিটি রচনাই একটি মানুষের শিশুস্বত্তাকে জাগ্রত করে তুলতে সক্ষম, এমনই লেখনি শক্তি। হো হো প্রানখুলে হাসতে চাইলে পরতেই হবে, আবোল তাবোল, হ জ র ল ব, পাগলা দাশু, বা হেসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি ইত্যাদি রচনা গুলি, প্রত্যেকটি দুষ্প্রাপ্য হীরকখণ্ড স্বরূপ। শিশু মনের গভীরে এমনই প্রভাব বিস্তার করে এই ‘অযৌক্তিক” ছড়া বা চরিত্রগুলো যে, কখনই সেই ঘোর থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভবপর হয়না। এ বিষয়ে বাঙালী অন্যান্য অনেক ভাষাভাষী জাতির থেকে বিপুল ভাবে ধনী।

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য গঠনের উপযোগী শিশু কিশোর সাহিত্যিকেও কিছু অলিখিত মানদন্ডের যোগ্যোতা অর্জন করতে হয়। তবেই সেটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। শিশুর পরিবারের সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, শৈল্পিক পরিকাঠামো, এবং প্রযুক্তি বান্ধবতা শিশু কিশোর সাহিত্যের  মধ্যে প্রতিফলিত হতেই হয়। শিশুর মধ্যে লড়াইএর একটা মানসিকতা দরকার, আর প্রাথমিক ভাবে সেটা অবশ্যই একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সহপাঠিদের থেকে নিজেকে এগিয়ে রাখার মানসিকতা। শুধুমাত্র লোকাচার, রূপকথা বা মহাপুরুষদের জীবনী বানী নির্ভর শিক্ষা না হয়ে সেগুলির ফলিতরূপকে সহজভাবে জীবনের উপরে প্রয়োগ করার শিক্ষা দেওয়া বা উৎসাহিত করার বিষটা সাহিত্যে স্থান পাওয়াটা জরুরী। বিভিন্ন লৌকিক ও নৈতিক শিক্ষা, ও সহজাত প্রতিভাগুলির ক্রম অনুশিলনে উৎসাহ প্রদানের তাগিদ দেওয়াটা শিশু কিশোর সাহিত্যের অন্যতম উদ্দেশ্য। পরিবার, দল, সংগঠন, রাষ্ট্র তথা কতৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রনের মাঝে থেকে নিজেকে স্বাতন্ত্ররূপে প্রকাশ করার শিক্ষাটা বহুলাংশেই শিশু কিশোর সাহিত্য থেকেই আসে। নিরন্তন পর্যলোচোনা করা, ও সমালোচোনাকে সাদরে গ্রহন করার উপযোগী করার মানসিক দৃঢ়তাকে রূপ দান করার তালিমে শিশু কিশোর সাহিত্যের অনুকল্প নেই। সাহিত্য এমন হওয়ার দাবি রাখে, যে শুধুই কেতাবি বুলি আউড়ানো উন্মাদ বানাবেনা। রঙ ,রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধে জারিত পরিপূর্ণ মানুষ বানাবে, সাহিত্য এমনই হওয়া উচিৎ।

বাংলা ভাষাতে অনুবাদিত জনপ্রিয় বিদেশি শিশু কিশোর সাহিত্যগুলোকেও বাঙালী আপন করে নিয়েছে। যেমন গালিভারের গল্প, রুশ লোককথা, বেতাল বিক্রমাদিত্যের গল্প, আরব্য রজনীর গল্প, রবিনহুডের গল্পকে আমরা বাঙলা বলেই পড়ে জেনেছি ছেলেবেলায়। সাহিত্যগুন আর ভাষার সারল্য থাকলে শিশুমনের কল্পনাতে পাকাপাকি স্থান করে নিতে বেশি সময় লাগেনা, যেটা শতাব্দির পর শতাব্দী জুড়ে স্বীকৃত।

সাধারণত শিশুরা অধিক পরিমানেই কল্পনাশক্তির অধিকারী হয়। পরিবার পরিজনকে নিয়ে একটা কাল্পনিক জগত তৈরি করে নিজের চারিপাশে। এক্ষেত্রে সদর্থক তথা ইতিবাচক ফলাফল পেতে উৎকৃষ্ট শিশু কিশোর সাহিত্যের জুড়িমেলা ভার। আগামীর মানুষটি কেমন হবে সেটাও শিশু কিশোর সময়ের শিক্ষার উপরে নির্ভর করে। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধার্মিক, পেশাদারী, ও জাতীয়তাবাদী স্বত্তার অঙ্কুর বিকশিত হওয়ার আদর্শ সময়। সুতরাং দেশাত্ববোধক বা আত্মত্যাগের মত মহান তাৎপর্যপূর্ন বিষয়ের শিশু কিশোর সাহিত্য, বিনোদোনের মোড়কে শৈশোবের আবেগ মেশানো নৈতিক ও সাধারণ জ্ঞান পূর্ন শিশু কিশোর সাহিত্যের অবদান শিশু জীবনে অসীম গুরুত্বপূর্ন।

শেষেও সুকুমারী ভাষাতেই বলি-

চাঁদের আলোয় পেঁপের ছায়া ধরতে যদি পারো,

শুঁকলে পরে সর্দিকাশি থাকবে না আর কারো।

আমড়া গাছের নোংরা ছায়া কামড়ে যদি খায়,

ল্যাংড়া লোকের ঠ্যাং গজাবে সন্দেহ নাই তায়।

কোনো সন্দেহ নেই, উপযুক্ত শিশু কিশোর সাহিত্যই অপরিণত শিশু মগজে পুষ্টি জুগিয়ে, ল্যাংড়া মগজের ঠ্যাং গজিয়েই ছারে।

***সমাপ্ত***

স্বজাতীয় রচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *