“ধার্মিকেরা নিজ ধর্মের আচার পালনে মগ্ন থাকে, ধর্ম ব্যবসায়ীরা অন্য ধর্মের প্রতি আক্রমন করে ধর্মাচার্য পালন করে”। এটাই আপ্তবাক্য।

আজকের দিনে এই যে রামনবমী নামের একটা হাল উৎসব নিয়ে এতো অস্ত্রের মাতামাতি, ঝঙ্কার, ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি, সমাজে অস্থিরতা, এর শিকড় কোথায়? কিইবা এর আসল ইতিহাস? চলুন একটু শাস্ত্র ঘ্যেটে দেখা যাক।

ঋগ্বেদে (১০-৯৩-১৮) সর্ব প্রথম ‘রাম’, নাম হিসাবে শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। সুতরাং রামায়ণের অনেক পূর্ব থেকেই রামনাম্নী অনেকের উল্লেখ রয়েছে শাস্ত্রে। যদিও তারা একই ব্যাক্তি বা আলাদা কিনা সবটা সুস্পষ্টভাবে জানা যায়না। শ্রী বিষ্ণুর অবতার ‘পরশুরাম’, বা মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের ভাই ‘বলরাম’ এবং দশরথ পুত্র রঘুবংশীয় ‘রাম’ এমন অনেক বিশিষ্ট রাম হিন্দু ধর্মে আরাধ্য।

সূর্যবংশীয় তথা রঘুনাম্নী রাজার নামানুসারে রঘুবংশীয় রাজা দশরথের জ্যাষ্ঠ পুত্র শ্রী রামচন্দ্র। আর্য রাজা, তৎকালীন দিনে আজকের মত পদবী গুরুত্ববাহী ছিলনা তাই শুধুই রাম। রাম কাহিনী সম্পর্কিত এক আধটা উপাখ্যান বাদ দিলে সবগুলোকেই রামায়ন নামে অবিহিত করা হয়েছে। রামায়ণ নিঃসন্দেহে মহাভারত আখ্যানের অনেক পূর্বে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, কারন মহাভারতে রামায়ণের কথা উল্লেখ থাকলেও রামায়ণের কোথাও মহাভারতের ছিটেফোঁটা নেই। মহাভারত প্রায় সমস্তটাই নগরজীবনের কথা বলে, অনেক বেশি জটিল, এখানের সকল বড় চরিত্র গুলোই আর্য। সেদিক থেকে রামায়ণ অনেকটা অরণ্য কেন্দ্রিক, অনারম্বর, আর্য অনার্যের লড়াই।

পতঞ্জলি মুনির ‘ত্রিমুনিব্যকরণ’ অনুযায়ী ‘লৌকিক সংস্কৃত’ ভাষাতে, রাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ সম্ভবত ‘শুরু’; অবশ্য আদি শঙ্করাচার্যের মতে রাম মানে হল- ঋষি বা তাপসেরা যার সাথে রমণ তথা ধ্যন করে সর্বোচ্চ তৃপ্তি লাভ করেন তিনিই রাম, শ্রীবিষ্ণুর সপ্তম অবতার। সংস্কৃত ভাষায় রচিত আদি রামায়ণের রচয়িতা হিসাবে মহর্ষি বাল্মিকীর নাম আমরা সকলেই জানি, কিন্তু এই সংস্কৃত ভাষাতেই আরো বেশ কয়েকটি রামায়ণের সন্ধান মেলে; যেমন আধ্যত্ব রামায়ণ, আনন্দ রামায়ণ, যোগ রামায়ণ, ভুশন্ডি রামায়ণ ইত্যাদি।

যেহেতু সংস্কৃত ভাষার নির্দিষ্ট কোনো বর্ণমালা ছিলনা, (আজও নেই, নাগরী বা দেবনাগরীই বেশি ব্যবহৃত হয় সংস্কৃত লিখনে) তাই শ্রুতি পদ্ধতিতে সংরক্ষিত রামায়ণ মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে স্থান কাল পাত্র ভেদে, বারে বারে পরিবর্তিত হয়েছে। নানা যুগে নানা দেশে কবিরা তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে, তাদের নিজস্ব কল্পনাতে রামকে এঁকেছেন। বাল্মীকির রামায়ণের রাম মহাশক্তিধর পরাক্রমশালী, তুলসীদাসী রামায়ণের রাম রক্তমাংসের মানুষ, যাকে চাইলেই ধরা যায় এতটাই সার্বজনীন। আবার কৃত্তিবাসী রাম নয়নাভিরাম সুন্দর পুরুষ, অপরিসীম করুণার ধারা, অলৌকিক শক্তিতে ভরপুর ও ভীষণ প্রজাবৎসল রাজা। রামায়ণের বিখ্যাত গবেষক কেমিল বাঙ্ক, 1950 সাথে প্রকাশিত “Three Hundreds Ramayana’s” নামক বইটিতে তিনি সারা বিশ্বে প্রায় ৩০০ টি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রামায়ণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে বৌদ্ধ রামায়নে রাম-সীতা ভাইবোন, জৈন রামায়নে রাবন ভীষণ সৎ একজন রাজা, নেপালি কবি ভানু ভক্তের ‘নেপালি রামায়ণ’, কন্নর ভাষায় ‘তোরবেয় রামায়ণ’ এখানে সীতার পিতা রাবণ, যিনি হাঁচির মাধ্যমে জন্মগ্রহন করেছিলেন। অহমিয়া ভাষাতে ‘মাধব কণ্ডলীর’ রামায়ণ, তামিল কোম্বন ভাষাতে ‘ইরামবাতায়ম’, আর বাংলাতে কৃত্তিবাসী রামায়ণ ভীষণ প্রসিদ্ধ।

বিদেশের মাটিতে মানে এশিয়ার অন্যান্য দেশেও রামায়ণের হদিশ পাওয়া গেছে। শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যাণ্ড, ফিলিপিন্স সহ অনেক দেশেই রামায়ণের অস্তিত্ব ও চর্চা আজও বিদ্যমান। মূল রামায়ণকে কেন্দ্র করে যেমন অনেক ভাষায় রামায়ণ লেখা হয়েছে, ঠিক তেমনই রামায়ণের অংশ নিয়ে প্রচুর গ্রন্থ লেখা হয়েছে। মনের রঙে মাধুরী মিশিয়ে রচিত হয়েছে নতুন নতুন কাহিনি। রঘুনন্দন গোস্বামী, রামানন্দ ঘোষ, জগৎরাম, রামপ্রসাদ প্রমুখ এরকম অনেকেই রামায়ণ অবলম্বনে কাব্য রচনা করে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেছেন। কালিদসের ‘রঘুবংশম্’, ভাসের ‘প্রতিমা’ ও ‘অভিষেক’, ভবভূতির ‘মহাবীরচরিত’ ও ‘উত্তররামচরিত’, ভট্টির ‘রাবণবধ’, কুমারদাসের ‘জানকীহরণ’, মুরারির ‘অনর্ঘরাঘব’, ক্ষেমেন্দ্রর ‘রামায়ণমঞ্জরী’, রাজশেখরের ‘বালরামায়ণ’, জয়দেবের ‘প্রসন্নরাঘব’, ভোজের ‘চম্পূরামায়ণ’, ঈশ্বরচন্দ্রের ‘সীতার বনবাস’, রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকির প্রতিভা’, রামশঙ্করের ‘রামায়ণ’, দ্বিজলক্ষ্মণের ‘শিবরামের যুদ্ধ’, মাইকেল মধূসূদনের ‘মেঘনাদবধকাব্য’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলি রামায়ণের অংশ নিয়েই রচিত হয়েছে এবং ভারতীয় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

কোথাও অস্ত্র সহযোগে মিছিলের বিবরণ নেই। এই মিছিল কি রামকে সন্তুষ্ট করার সাধনা? কোনো মুনিঋষিই এই তান্ডব সাধনা করেছেন বলে শাস্ত্রে নেই। ক্ষত্রিয়ের ধর্ম অস্ত্রচালনা, যেটা আজকের দিনে পুলিস বা সেনার কাজ, নাগরিকের নয়। যদি নাগরিকের হয় তাহলে রাজ্যের (পড়ুন দেশের প্রধানমন্ত্রী/মুখ্যমন্ত্রী) চুরান্ত অপদার্থ ও অযোগ্য। তাদের মুখোশ খুলে দিয়ে ওদের বদলে দিতে আবার শাস্ত্রে ফেরা যাক।

এতদ সকল কিছুকে ছাপিয়ে তুলসীদাসি রামায়ণ সবচেয়ে জনপ্রিয়। এক বাঁদরের/কপির মুখে একটা দোঁহা শুনে শ্রীরামের প্রতি তীব্র অনুরাগ জন্মায়। যুবক তুলসীদাস গোস্বামী বারানসির কুটিরে প্রভু রামের নিমিত্ত একান্ত সাধনা করে চলেছেন, তার ইচ্ছা প্রভু রামের সাক্ষাৎ লাভের। কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই ফলপ্রসু হচ্ছেনা, ঠিক এই সময় একদিন কাশীর উপবনে প্রাত্যঃকৃত করে অবশিষ্ট জলটুকু প্রতিদিনের ন্যায় একটি একটি নির্দিষ্ট গাছের গোঁড়ায় ঢালার সময় সেই গাছ থেকে নেমে আসে একটি প্রেতযোনি। সাধক তুলসীদাসের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীরামের সাক্ষাতের উপায় বাতলে দেন সেই প্রেতযোনি।

দশাশ্বমেধ ঘাটের নিকট কর্ণঘন্টায় প্রতিদিন যে রামায়ণ পাঠ হয় সেখানে এক বৃদ্ধ সাধুর বেশে স্বয়ং অঞ্জনীপুত্র মহাবীর হনুমান আসেন। সেই মত সাধক তুলসীদাস মহাবীরের সাক্ষাৎ পেলেন, এবং হনুমান তুলসীদাসকে চিত্রকূটে যাবার পরামর্শ দিলেন। সেই মত চিত্রকূটে গিয়ে আরো দীর্ঘ তপস্যার পর মন্দাকিনীর তীরে, রাম-লক্ষণ জুটির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তুলসীদাসের দাবী অনুযায়ী আরো দুইবার দেবসাক্ষাৎ এর সৌভাগ্য তার হয়েছিল। কখনই তাঁকে গদা আস্ফালন বা গলার শিরা ফুলিয়ে শিশুদের হাতে তরোয়াল দিয়ে জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিতে হয়নি। অবশ্য তাঁকে MLA বা MP হতেও হয়নি কখনো, বাসনা ছিল বলেও জানা যায়না।

এদিকে আমাদের সাধক শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনী থেকে জানা যায়, তিনিও বুঝেছিলেন তাদের কূলদেবতা রঘুবীরের দর্শন পেতে শুধু ‘মা’কে ধরলেই চলবেনা, তাই তিনি মহাবীর হনুমানের স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন। সে সময় হনুমানের আশির্বাদ লাভের জন্য, তার ধ্যনে বিভোর হয়ে মানবসত্তা পরিপূর্ণ রূপে লোপ পেয়ে গেছিল। সেই সময় তিনি বৃক্ষেই বসবাস করিতেন, ফলমূল খেতেন ও সেখানেই শুতেন। রঘুবীর-রঘুবীর বলে নিরন্তর গম্ভীর ভাবে শ্রীরামের অন্বেষণ করতেন। ঠাকুরের নিজের জবানিতে- “আমার মেরুদণ্ডের শেষভাগ প্রায় ইঞ্চিখানেক বৃদ্ধিও পাইয়াছিল, পরে যা কালের নিয়মে যবে মনের উপরে মহাবীরের ভাবের প্রভাব চলিয়া গেছিল, তবে পুনরায় উহা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া আসে”। সুতরাং ইনিও অস্ত্র মিছিল করেননি।

শ্রী চৈতন্য ও স্বামী বিবেকানন্দও রামভক্ত মহাবীর হনুমানের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধালু ছিলেন। স্বামীজির কথায়- “মহাবীরের চরিত্রকে তোমরা আদর্শ করে নাও। তার জীবন মৃত্যু সংক্রান্ত ভয়কে তিনি জয় করেছিলেন, নিজের বিচার বুদ্ধির উপরে ওনার সম্যক ধারণা ছিল ও সেটাকে কিভাবে সত্যের পথে চালনা করতে হয় সেটা তিনি জানতেন। গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি ও কঠোর ব্রহ্মচর্য তাঁর সাফল্যের কারন। তাই তোমরা তোমাদের জীবনকে তাঁর আদর্শে গড়ে তোলো, যাতে অন্যান্য আদর্শ ও ভালগুলো নিজ নিজ জীবনে নিশ্চিত হয়”। আমরা এগুলোর একটাও না মেনে শুধু গাড়লের মত কিছু নেতাদের অন্ধ ভক্ত হয়ে বসে আছি।

অলৌকিকতা, অপ্রার্থিবতা, জনসাধারনের কাছে রহস্যাবৃত আর কুহেলিকাময় কারনবসত অকারন যুদ্ধের কারনে, ‘রামায়ণ ও মহাভারত’ অতি উচ্চমানের রচনা- ধর্মীয়ভাবে পূজিত ও সমাদৃত হয়ে রইলেও, ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে মোটেই স্থান করে নিতে পারেনি। ধর্মীয় জাতিগত আবেগ ও বিশ্বাস দিয়ে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা যায়না। রামায়ণ বা মহাভারতের ইতিহাসের প্রতি দায় না থাকার কারনে সহজেই একে পরিবর্তন করে দেওয়া যায়, সনাতন ধর্মের উদারতার নামে। যুক্তিযুক্ত নিরপেক্ষ বিচার বিশ্লেষণ পৃথিবীর কোনো ধর্মই চাইনা। ধর্ম মানেই প্রশ্নহীন আনুগাত্য। ভোটের কারবারিরা এই ব্যাথার স্থানটাকেই ধরে ‘রামরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার জন্য উদগ্রীব। এখানে শম্বুক বা বালির দোষ জানতে চাওয়া মানেই ধর্মের শত্রু। তাই এ লেখার ক্ষেত্রেও সংঘাতের সম্মুখীন হলে তা মোটেই আশ্চর্যের কিছু নয়।

ব্রাহ্মন্যবাদীদের অত্যাচারে অতিষ্ট ভারতীয় নিম্নবর্ণের হিন্দুরা যখন মুক্তির পথ খুঁজছে ঠিক তখনই উত্তর ভারতে এই তুলসীদাসি রামায়ণের আবির্ভাব। সময়টা ১৫০০ শতকের শুরুর দিকে, যখন এই বঙ্গ দেশেও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মৌরিশপাট্টায় কুঠার হেনেছেন শ্রী বিশ্বম্ভর মিশ্র তথা শ্রীচৈতন্য (ফেসবুকের ভাষায় ফেক একাউন্ট) নামের যুগপুরুষ সমাজ সংস্কারক। তখন প্রতিনিয়ত মিথ ভেঙে তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক ইতিহাস।

তুলসীদাস সেইসময়ের কথ্য ব্রজবুলি, পালি বা প্রাকিত ভাষাতে তাঁর রামকে বর্ণনা করতে যাননি, বরং সহজিয়া লৌকিক সংস্কৃতের ছন্দে তিনি রামকে শূদ্রের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। তুলসীদাসের রাম মোটেই বাল্মিকীর রামের মত অতিপ্রাকৃত নয়। উচ্চবর্ণের হিন্দুর ঘরে যখন শিব, নারায়ণ, বিষ্ণু, কালী, চন্ডীতে একচেটিয়া আধিপত্য; হরেক ছুঁইছাতের মাঝে তুলসীদাসের রাম হয়ে উঠে সধারনের ঘরের ছেলে। দ্রুত নিম্ন বর্ণের হিন্দু সমাজের কাছে উচ্চবর্ণের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ার প্রতীক হয়ে উঠে রাম। গননার শুরু থেকে বা পরস্পরের দেখা হলে, কিম্বা মৃতকে সৎকারে নিয়ে যাবার সময় , প্রায় প্রতিটি ‘ছোটলোকেদের’ নামের মাঝে রাম শব্দটি ভীষণ ভাবে জুড়ে যায়। আজও চামার বা দলিতদের মাঝে রাম নামের প্রচলন ব্যাপক অর্থে। এখানেই তুলসীদাসের কৃতিত্ব, এখান থেকেই রামের একচেটিয়া জনপ্রিয়তা গোটা উত্তরভারত জুড়ে। বাংলায় এই প্রভাব না পরার কথা আগেই বলেছি, কারন তখন বৈষ্ণব মতবাদীয় ধারা ঐ রামের কাজটাই এই অঞ্চলে করেছিল শ্রীচৈতন্যের দ্বারা।

গোস্বামী তুলসীদাস ৪ নারীকে দেবী লক্ষ্মীর অবতারস্বরূপা জ্ঞান করেছেন। এবং জানিয়েছেন, এই চার প্রকার নারীকে অবমাননা করলে পুরুষের সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী।

• পুত্রবধূ— পুত্রবধূ সংসারের শ্রীকে ধরে রাখেন। বংশকে গতি প্রদান করেন। সেই কারণে তিনি শ্রদ্ধেয়া। তাঁর প্রতি কোনও রকম অসম্মান প্রদর্শন সংসারকে ছারখার করে দিতে পারে।

• ভ্রাতৃজায়া— বড় ভাইয়ের স্ত্রীর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন বস্তুত নিজের মা-কে অপমানেরই সামিল। আর কনিষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রী পূত্রবধূরই তুল্য। সে কারণে এঁদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন মহাপাপ।

• ভগিনী— ভগিনীকেও তুলসীদাস মাতৃসমা বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁকে অসম্মান করা মানে নিজের কুলকে অসম্মান করা।

• কন্যা— তুলসীদাস কর্তৃক প্রদত্ত তালিকার সব শেষে রয়েছে কন্যা। পিতা ও কন্যার সম্পর্ককে পবিত্রতম বলে মনে করছেন কবি তুলসীদাস। তাকে অবমাননা করার অর্থ নিজেকেই অবমাননা করা, এমনই মত গোস্বামীজির।

আমরা অস্ত্র মিছিল করি, কিন্তু ঘরে ঘরে এই সম্মান নারীদের দিই তো যারা রামকে মানেন ভগবান হিসাবে?

‘রামচরিতমানস’-এর মূল কাহিনি কাঠামোতেও বার বার উঠে এসেছে এই প্রসঙ্গ। শ্রীরামচন্দ্রের জীবনকে সামনে রেখে গোস্বামী জানিয়েছেন নৈতিক বিধানগুলিকে। নারী তাঁর কাছে অতি পবিত্র। তাঁর রামকথা-তেও তাই সেই দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত।

চন্দ্রাবতী রামায়ণ বা সুকুমারী রামায়নে কোথাও রামজন্মের তিথি পালনে হিংসা বা শৌর্যের প্রকাশের উল্লেখ নেই। ডাঃ আম্বেদকরের ‘হিন্দুধর্মের হেঁয়ালি” গ্রন্থের একটা বঙ্গানুবাদ রয়েছে পয়ার ছন্দে, শ্রী সুধীর রঞ্জন হালদার মহাশয় অত্যন্ত নিপুণ ভাবে ‘রামচরিত কথা’ বর্ণনা করেছেন তীব্র শ্লেষের সাথে। শ্রী হালদার আরেক ব্রাহ্মণ শোষিত হিন্দু সমাজ মতুয়া সম্প্রদায়ের।

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজেও রামের দেখা পাননি, তবে সীতা মায়ের মাতৃরূপের দর্শন পেয়েছিলেন। সুতরাং প্রভু রামের সান্নিধ্য পেতে এই সকল মহাপুরুষেরা কঠিন ব্রহ্মচর্য থেকে আরো কঠিন সাধনার মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছিল। ডিজে বাজিয়ে বাইকে চড়ে গদা নাচিয়ে নয়।

প্রশ্নটা এখানেই, শাস্ত্রে এই অস্ত্র প্রদর্শনের কথা কোথায় উল্লেখ রয়েছে? যদি না থাকে তাহলে পুনরায় রামায়ণ লিখিত হয়েছে আজকের সমাজের প্রয়োজন অনুসারে। সেই রামায়ণের লেখক কে? মাথায় ফেট্টী বেঁধে হাতে খোলা তরিবারি আসলে মহরমের সময় শিয়া মুসলমানদের করা নিকৃষ্ট আচারের অনুপন্থী, এটাই চুম্বকে আজকের এই রামনবমীর বিকৃত উল্লাস চিত্রের ধাত্রী।

এই রাম একান্তই RSS এর কল্পনাপ্রসূত। এই ‘বিভেদকামী রাম সংস্কৃতি’ বিজেপি নামের দলটি বাস্তবায়ন করেছে অর্ধেক দেশে। খোদ অয্যোধ্যা, ইলাহাবাদ সহ গোটা উত্তর ভারতে এমন উন্মত্ত রামনবনীর দেখা মেলেনা, যেটা আজকাল বাংলার রাস্তায় দেখা যাচ্ছে। অনেক স্থানে রামনবমী উপলক্ষে আবীর খেলা হয়। আসলে এটা তো ভগবানের জন্মদিন উৎসব পালন। শিয়া’রা হাসান হোসেনের মৃত্যু শোক যে উপায়ে পালনের সংস্কৃতি দেশে আমদানি করেছে, রামের জন্ম উপলক্ষে সেই একই সংস্কৃত হল আজকের রামনবমী। বাংলার আকাশ কলুষিত করেছে এই দুই দূষিত সংস্কৃতি।

খুব সুস্থ ভাবে ভাবুন, আমার আপনার বাড়িতে কেউ জন্মালে বা কারো মৃত্যু হলে আমরা লোকদেখানো তলোয়ার, গদা, আগ্নেয়ান্ত্র নিয়ে সদলবলে মিছিল করি? অন্য ধর্মের মানুষদের হুঁশিয়ারি দিই? দিইনা, তাহলে ঈশ্বরের নামে এই অনাচার কিসের স্বার্থে?

রাজ্যের শাসক দল তৃনমূল কংগ্রেস, আজ নিজেদের হিন্দু প্রমান করতে মরিয়া, তারাও সম উদ্যোমে RSS সংস্কৃতির অনুশীলন করছে বিজেপিরিই দেখানো পথে। কার মিছিল কতটা লম্বা, কে কত জোরে জয়-শ্রী-রাম নাদে হৃদকম্প তুলতে পারে তারই ঘৃণ্য কসরৎ চলছে রাজ্যজুড়ে। এদের স্যাঙাৎ হচ্ছে টেলিভিসন মিডিয়া। কোনটা ধর্ম আর কোনটা ধর্মের নামে ভাঁওতা বাজি সেটার ফারাক করার মত শক্তি একটা ফ্যাসিবাদি দলের কাছে থাকেনা। তার উপরে ভুকা মানুষগুলোর সামনে উৎসব আর রাষ্ট্রীয় শাস্তির চাবুক যারা ঝুলিয়ে রেখে শাসন করে, ধর্মের নামে এমন নেশাদ্রব্য কেউ কিভাবে ছেড়ে দেয়!

যারা নাকি বুদ্ধিজীবি, তারাও আজ প্রতিবাদ ভুলে রাষ্ট্রের গুডবুকে আছে, ঝঞ্ঝাটমুক্ত আগামীকালটা ভাল থাকার দায়ে। বড় অল্পে এনারা আজকাল বিকিয়ে যান, এটাই আজ বাংলার সংস্কৃতি।

নিকৃষ্ট দেউলিয়া রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ধর্মের মুখোস পরে। জাতি হিসাবে বাঙালী তরতর করে অবনমনের রাস্তায় ধাবমান। এবাংলা থেকে ওপাড় বাংলা, ফলাফল একই। এখানে RSS, ওখানে জামাত। নিচুতলার দুষ্কৃতীরা আজকের রাজনীতিকে তোলার/চাঁদার বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণ করছে, যার ফলে অশিক্ষিত লুম্পেনরা ধর্মের জিগিরে পেশি আস্ফালন করে চলেছে। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি আজ সঙ্কটে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কৌশলে হাসিল করার জন্য এক শ্রেনীর লোভী নিকৃষ্ট ‘হিন্দু’ নাম নিয়ে এই ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে প্রথমে ভীত করে দাও, যে ২০% মুসলমান তোমাদের ৮০%কে ভয়ানক বিপদের মাঝে রেখে দিয়েছে। অতএব অস্ত্র তুলে নাও। শুধু বললে কি আর কেউ অস্ত্র নেয়! অতএব শাস্ত্রের ষোড়শপাক রেঁধে তাঁর উচ্ছিষ্ট গুলো দিয়ে নিজেদের স্বার্থমত ধর্মগ্রন্থকে খোলনাচলে বদলে যেটাকে শাস্ত্র বলে চালানোর প্রচেষ্টা হচ্ছে, তা ভয়াবহ। এটাই আজকের রামনবমী, হিন্দু ভোট BJP এর পক্ষে যাক, মুসলমানগুলো TMC এর দিকে ঝুঁকুক। বামেদের থেকে রক্ষা করার জন্য দেশদ্রোহী শব্দটাই যথেষ্ট।

আজ দেশীয় মুসলমানেরা ভাবুক, বিজেপি বিরোধী শক্তি হিসাবে তৃনমূল অদৌ বিশ্বাসযোগ্য? তৃণমূলকে ভোট দেওয়া মানেই পরোক্ষে RSS এর দুর্গার হাত শক্ত করা। দেশের জন্য বিপদের নাম RSS, এরাই আফগানিস্থানে তালিবান, সিরিয়াতে ISIS, অতীতে নাৎসি। দেশপ্রেমের নামে দেশে এক মারন বিচ্ছিন্নতাবাদের খেলা শুরু হয়েছে। রামনবমীর এই অস্ত্র মিছিল সেই খেলারই মুখরা বা অন্তরা।

আমরা তো আবার বামপন্থী, ধর্ম শব্দেই এলার্জি। আমরাও সেই ভক্তদের মত কপিপেষ্টের ভরষাতে থাকি, নিজেদের পড়াশোনার যে কৃষ্টি, সেটা জলাঞ্জলি দিয়ে ওদের লেভেলে নেমে আসি। ওদের ভাষাতে কথা বলে নিজেরা ভাবি জিতে যায়, মোটেই সেটা হয়না। বরং নিরপেক্ষ মানুষেরা খুঁজে পায়না বামপন্থীদের ব্যাবিহারিক ও আদর্শগত সৌন্দর্য। ভক্ত আর কড়া বামেদের মাঝে মৌলিক কিছু ফারাক খুঁজে পাওয়া যায়না দৃশ্যত। ওরা রামের নামে খিস্তি মারে, আমরা বামের নামে, সোশ্যাল মিডিয়া বাম-অবাম কৃষ্টির ফারাকটা অনেকটা ঘুচিয়েছে। আসলে কি জানেন, আমাদের নুন্যতম এই জ্ঞানের অভাবের জন্যই মানুষকে বোঝাতে পারিনা, যে এটা ধর্ম নয় যেটা বিজেপি-RSS-তৃনমূল রামধনু জোট বাংলার বুকে সর্বনাশের খেলাতে নেমেছে। এমনতো নয় যে ধার্মিক মানুষের ভোট বামেদের প্রয়োজন নেই। সুতরাং জেনে রাখলে লাভটা বামেদের, আর বামেরা জিতে গেলে সমাজ জিতে যাবে। ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্কর যদি না এদের রোখা যায়।

নিখুঁত প্রেক্ষাপট। কুশীলবেরাও দুর্দান্ত অভিনয় করে চলেছে। আমরা ঠূটো জগন্নাথ হয়ে রয়েছি। সামনেই ভোট, আপনি ঠিক করবেন আপনি কার পক্ষে? রামের পক্ষে না রামকে যারা কলুষিত করেছে তাদের পক্ষে?

না শাসক মানছে রামের আদর্শ, না পারিষদেরা মানছে মহাবীরের জীবনী ধারা। গোটা সমাজটাই আজ বোবা হয়ে রয়েছে। কোনো কিছুতেই আর এর বিবেক জাগ্রত হয়না, উৎসবাক্রান্ত শবের দল। ঐহিত্যপূর্ণ সনাতন ধর্ম আজ সত্যিই সঙ্কটে। গোঁড়া মুসলমানদের জন্য আজ গোটা জাতিকে পরিকল্পিতভাবে বদনাম করা হয়। সেই দিন খুব দূরে নয়, যখন হিন্দু জাতিকেও পৃথিবীর হিংস্র জাতি হিসবে তকমা লাগিয়ে দেবে। নাস্তিকেরা চিৎকার করে প্রতিবাদ করুন, ধার্মিকেরা ধর্মকে রক্ষা করুন এই ধর্মব্যাবসায়ীদের হাত থেকে, যারা গোমাতার পুজো করে ভোট ভিক্ষা করে আর দেশকে ১ নম্বারে নিয়ে যায় ওই গোমাংশ রপ্তানি করে।

ধিক এই মৃত সমাজকে।

  • তথ্যসুত্রঃ বাংলাপিডিয়া
  • উইকিপিডিয়া
  • ডেইলি হান্ট নিউজ
  • এবেলা
  • চরৈবেতি ব্লগ

উন্মাদ হার্মাদ

স্বজাতীয় রচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *