প্রেম শব্দটাই প্রেমে পড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট।

বয়ঃসন্ধির শুরুতে হরমোনের প্রভাবে কিশোর দেহে যে শারীরবৃত্তিয় প্রভাবগুলো পরিলক্ষিত হয়, সেই রেশমপথ বেয়েই নারীপুরুষের চিরাচরিত জৈবিক প্রেমের আগমন ঘটে জীবনে; যে ধারা মৃত্যুর পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে।

প্রেম চিরন্তন কিন্ত কুশীলবগন নয়। একটি ধ্রুবক চরিত্রকে কেন্দ্র করে প্রেম ঘড়ির কাঁটার মত ঘুরে চলে। বিবাহজনিত পরিনতিই যদি একমাত্র বিচার্য না হয় তাহলেদেখা যাবে গোটা পৃথিবী জুড়েই সকলেই প্রেমিক প্রেমিকা, সময়ের সাথে যা ক্রমাগত এক মন থেকে অন্যমনে স্থানান্তরিত হয়ে চলেছে। প্রেমের কোনো সীমা হয়না, তাই প্রেম পরিমাপ করাও যায়না। একক হিসাবে এতোটা, বা অতোটা শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয় অথবা অন্যের সাথে শুধু তুলনা করা সম্ভব। একজনের সাথে প্রেমের বন্ধন রয়েছে মানে অন্য কারোর প্রেমে পড়া যাবেনা এমন কোনো ছকেবাধা প্রাকৃতিক নিয়ম নেই, তবে সমাজের কথা আলাদা। তার হরেক স্তর আর স্তরে স্তরে ঠাসা নিয়মের বেড়া।

দৃশ্যমান প্রেম সাধারনত দুই ধরনেরই হয়। একমুখী ও উভমুখী। একমুখী প্রেম সর্বদাই দীর্ঘস্থায়ী হয়, কারন এখানে যাবতীয় শর্তাবলী সবটাই নিঃশর্ত। নিজের মননের সাথেই দ্বিতীয় প্রতিভূটাকে কল্পনা করে নিয়ে গোটা কল্পনা বিলাস, এ প্রেম অক্ষয় ও নিষ্কাম। উভমুখী প্রেম সামাজিক চাহিদা সময়ের উপরে নির্ভরশীল। এই প্রেমের পরিনতিতেই আছে চরম সুখ ও অনন্ত বেদনা, বিচ্ছেদের মর্মপীড়া। এই ধরনের প্রেমেই নিজেকে সবটা উজার করে দেবার পর, কল্পনার চাহিদার সাথে বাস্তবের মিল না ঘটলেই আসে অবধারিত সংঘাত, ব্যবকলনের পক্ষ।  

ঠিক এই মুহুর্তে একপক্ষ নিজেকে গুটিয়ে নিলে অন্যপক্ষ হয় সেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন অথবা অহংবোধের বসবর্তী হয়ে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠেন, ফলত বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী। এটা জীবনের প্রশ্ন, তাই কেউ চলে যাবার হলে, যতই আটকাবার প্রচেষ্টা করা হোকনা কেন, তাকে বিরত করা অসাধ্যসাধন। কারন ওই মানসিক দুরত্ব, যে দুরত্ব মানুষদুটোর জীবন দর্শনের পৃথক সংজ্ঞা গড়ে দিয়েছে। সুতরাং অপরপক্ষ যাবেই, এটাই কালের নিয়ম।

চলে যাওয়া মানে মনে হতে পারে হিসাব নিকাশের অধ্যায়টা চিরতরে মুছে দায় গেছে, কিন্তু মনস্তত্ব এতোটাও সহজ নয়। বরং বলা যেতে পারে একটা খাতাকে খুলে রাখা আছে, যেটাতে অনেক কিছু লেখা যেত। এখন সেটা অন্যে ব্যবহার করবে বা কালের প্রকোপে জীর্ন বিদীর্ণ হবে। মানসিক দুরত্বের কারনেই অনেকেরই, দুদিন আগের সেই কাছের মানুষটাকেই হঠাৎ করে প্রতিদ্বন্দী মনে হতে লাগবে, কারন দুজনের চিন্তাসুত্রটা এই সময় বিপরীতমুখী বহমান থাকে। শান্তি পেতে চাইলে, যিনি যাচ্ছেন তাকে তার মত করে যেতে দেওয়াই উত্তম, এক্ষেত্রে অবজ্ঞার একটা নিঃশব্দ বার্তা থাকে। মানসিক কষ্ট অবশ্যই হয়ে, কিন্তু সেই কষ্ট চেহারাতে বা আচার ব্যবহারে ফুটে বেড় হলে বাস্তবিক অর্থে কোনো লাভ হয়না, অহেতুক শরীরের অবক্ষয়।

একটা ভালোবাসা বা প্রেম জন্মায় সময়ের প্রলেপের উপরে ভিত্তি করে, একজন মানুষের হাত ধরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করলে স্বাভাবিক নিয়মেই তার প্রতি মায়া জন্মাবে। যদি বিপরিতমুখী মানুষটাও সম ভাবনার সাওয়ারি হন তবেই সম্পর্ক পরিণতি পাবে।  এই মায়াই আসলে প্রেমের অঙ্কুর, এটাকে অপরজন কতখানি মুল্য দিচ্ছে, ও এই মায়ার উপরে তার দৃষ্টিভঙ্গি কি; সেটাই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারন করবে। অবহেলা সত্বেও এক তরফা কাউকে ভালোবেসে কখনই কারো মন জয় করা সম্ভব নয়। প্রেম আর অবহেলা একসাথে থাকতে পারেনা কোনো পরিস্থিতিতেই। যে সত্যিকরে ভালোবাসে সে কখনো তার সঙ্গীকে অবহেলা করবে না। যদি সেখানে অবহেলা পরিলক্ষিত হয় তাহলে জানুন সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা নামক বস্তুটির অস্তিত্ব ফিকে হচ্ছে।
পরিবর্তনই জগতের নিয়ম। দিন বদলায়, ঋতু বদলায়, সময় বদলায়, সাথে পরিস্থিতিও। অতএব মানুষ বদলাবেনা সেটা হতে পারে! তবে নিজেকেও সেই পরিবর্তিত পরিবেশের উপযোগী করে তুলতে হয়, প্রেমের জন্যেও যার কোনো ব্যাতিক্রম নেই।

কেউ পাল্টে গিয়ে দূরে সরে যান, আর অন্যজন তার জন্য মূল্যবান অশ্রু ঝড়ান। এগুলো সম্পূর্ন এক ধরনের অযৌক্তিক ক্ষীনবুদ্ধি কর্ম । কাজটা খুব কঠিন ঠিকিই কিন্তু তাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করারই সর্বোত্তম বিহিতক। স্বাভাবিক নিয়মেই পুনরায় জীবনে প্রেম আসবে, তাই সৃজনশীল কর্মের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে পুরাতন ভুলগুলোর প্রতি আরো যত্নশীল হয়ে নিজেকে বদলানো উচিৎ। যিনি গেছেন তাকে দেখানোর জন্য মোটেই নয়; যে জীবনে নেই তাকে অযথা কল্পনাতে রাখা অবান্তর। শরীরীভাষা দেখলেই যারা বোঝার তারা ঠিক বুঝে যাবেন। ভালো থাকাটা আসলে একটা সু অভ্যাস, উন্মাদকে ভালোবাসা যায় কিন্তু ভালবেসে উন্মাদ হওয়ার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। দৃশ্যমান পরিবর্তন অন্য মানুষটিও অবশ্যই খেয়াল করবে, নিশ্চিত করবে। সে আবার তখন জীবনে ফেরার চেষ্টা করবে, নানান প্রয়াস প্রচেষ্টা করতেই থাকবে। বিশ্বাসঘাতকতার এটাই সবচেয়ে মধুর প্রতিশোধ। অন্যজনের এই বিশিষ্টের নাম মোহ, প্রেম নয়। সে মনটাকে ভালবাসেনি, ভালবেসেছিল চরিত্রের জৌলুসকে। যেটাতে মরচে লাগতেই সে পালিয়েছিল, আজ জৌলুস ফিরতেও সেও হাজির।

অনেকেই প্রেমে ব্যার্থ হয়ে আত্মহত্যার মত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, বা তার চেয়ে একটু কম। খাওয়া দাওয়া ছেরে দুনিয়া ভুলে উদাস বাউল হয়ে যান। আসলে এই মানুষগুলো চুড়ান্ত স্বার্থপর, না নিজেকে ভালবাসতে জেনেছে না আত্মীয় পরিজনকে। যে নিজেকে ভালবাসতে জানেনা , পরিবারকে প্রেম করতে জানেনা ; তার নতুন করে নিজেকে মূল্যায়ন করা জরুরি বৈকি, অদৌ প্রেমের প্রাথমিক পাঠ জানা আছে কিনা তাই কারোর চলে যাওয়াতে  ভেঙ্গে পড়াটা বোকামি। নিজের উপর সর্বদা ভরসা রাখাটাই বুদ্ধিমানের। নিজেকে আরো অনেক বেশি করে সময় দেওয়া প্রয়োজন, পরিবারকে সময় দেওয়া প্রয়োজন।

কেউই ভোলার জন্য ভালবাসেনা, আর ভালবাসার আগে ফলাফলের চিন্তাও করেনা। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন ঠাই। এখানে অঙ্কের নিয়মে দুই এ দুই এ পাঁচ হওয়া অবাস্তব কল্পনা মাত্র। মানসিক কষ্টকে তেতো অষুধের মত গিলে ফেলতে পারলে তার সামনে ভবিষ্যৎ রঙ্গিন। স্মৃতিকে মোছা যায়না, সুখস্মৃতিগুলোর অনুশীলন বাড়িয়ে,  কষ্টের স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করাটাই শ্রেষ্ঠ কাজ।

অত্যাচারী কখন শেষ হাসি হাসেনা, যে নিজের সাথে অবিচার করে সে সর্বাপেক্ষা বড় অত্যাচারী।

স্বজাতীয় রচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *